ওয়েব ডেস্ক : গোবর থেকে লক্ষ্মী লাভ! গোবরই পাঁচশোর বেশি মহিলার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা সত্যি। ঘরে বসে কাজ করে উপার্জনের পথ পেয়েছেন ওই মহিলারা। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে পরিবেশ বান্ধব হস্তশিল্পের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন দুই বন্ধু রোশন সিং ও সোনালী মেহেতা। করোনা অতিমারির সময়ে রাঁচির কাছে কিশোরগঞ্জে তাঁদের উদ্যোগে শুরু হওয়া স্টার্টআপ সংস্থা ‘গোভার ক্রাফট’ আশেপাশের গ্রামীণ এলাকার মহিলাদের যুক্ত করে এমনই এক উদ্যোগ নিয়েছে। ডিজাইনার প্রদীপ, লক্ষ্মী-গণেশ মূর্তি এবং আলংকারিক ঝুলন্ত সজ্জা-সহ ৪১ ধরনের ব্যবহার্য ও আলংকারিক পণ্য তৈরি করছে ‘গোভার ক্রাফট’। এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ মহিলারা নিজের বাড়িতে গোবর ও মাটির মিশ্রণ দিয়ে প্রদীপ, মূর্তি এবং সজ্জাসামগ্রী তৈরি করছেন।
সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায় যে, গবাদি পশু পালনের খরচ নিয়ে আলোচনা করার সময়ই সোনালী ও রোশনের মাথায় এই ধারণাটি আসে। তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে তা মালিকদের জন্য একটি আর্থিক বোঝা হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সবসময় গোবর যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না। এরপরই গোবর কোন ধরনের পণ্যের কাঁচামাল হতে পারে, যে পণ্য মানুষ কিনবে, তা তাঁরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। সেই অনুযায়ী দরকারি ও আলংকারিক জিনিস তৈরি করতে শুরু করেন, ধীরে ধীরে নকশা যোগ করেন এবং তাদের পণ্যের পরিসর বাড়ান। এর ফলে অতিমারির সময় একটি পরীক্ষা হিসাবে যা শুরু হয়, তা গবাদি পশুর মালিক, ঘরে বসে কাজ করা নারী এবং হস্তনির্মিত পণ্য সন্ধানকারী গ্রাহকদের সংযোগকারী একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
সোনালী ব্যাখ্যা করেন, ‘উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গোবরের সঙ্গে সামান্য মাটি মিশিয়ে মিশ্রণটিকে ছাঁচে চেপে দেওয়া হয়। আকার দেওয়া হয়ে গেলে, টুকরোগুলোকে শুকানো হয়, ফিনিশিং দেওয়া হয় এবং রঙ করা হয়। বিভিন্ন ছাঁচ এবং নকশা নারীদের একই মৌলিক উপাদান ব্যবহার করে প্রদীপ, মূর্তি এবং অন্যান্য গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করতে সাহায্য করে।’ সামনেই আলোর উৎসব দীপাবলি। তাই প্রদীপ, লক্ষ্মী-গণেশ মূর্তি এবং উৎসবের সাজসজ্জার উপর মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। উৎসবের সময় চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি বেড়ে যায় এবং এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নারীদের আরও কাজের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে রোশন বলেন, তাদের অনেকের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করতে পারাটা উপকারী। এটি তাদের কাজের জন্য অন্য কোথাও ভ্রমণ না করেই, গৃহস্থালীর দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি উপার্জন করার সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, যখন দুই বন্ধু কাজটি শুরু করেন, তখন তাঁরা পাঁচ-ছয়জন মহিলাকে একত্রিত করেন, যাঁরা ঝাড়খণ্ড স্টেট লাইভলিহুড প্রোমোশন সোসাইটি (জেএসএলপিএস)-এর অধীনে এই কারুশিল্পে প্রশিক্ষণ নেন। এই পাঁচজন মহিলা অন্যদের প্রশিক্ষণ দেন এবং এখন এলাকার বেশিরভাগ মহিলাই, যাঁদের গৃহকর্মের পর আর কোনও কাজ ছিল না, তাঁরা এই কাজে নিযুক্ত আছেন। সোনালী ও রোহন বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের সহায়তা পেয়েছি এবং যে মহিলারা পণ্যগুলি তৈরি করতে শিখেছিলেন, তাঁরা পরবর্তীকালে অন্যদের শেখাতে শুরু করেন। দক্ষতা এক মহিলার থেকে অন্য মহিলার কাছে স্থানান্তরিত হওয়ার সাথে সাথে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। মহিলারা পণ্যগুলি তৈরি করেন, আর স্টার্টআপটি তাদের কাজ বাজারে আনার দায়িত্ব নেয়।’ এই উপার্জন তাদের দৈনন্দিন খরচ পরিচালনার পদ্ধতিতে একটি পরিবর্তন এনেছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মহিলারা বলেন যে, আগে তাদের টাকার জন্য অন্যদের উপর নির্ভর করতে হতো এবং কখনও কখনও সন্তানদের চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খেতে হতো। এখন তারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে শিক্ষা ও সংসারের খরচে অবদান রাখতে পারেন। তারা পরিবারে নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তনের কথাও বলেন। স্টার্টআপটির সঙ্গে কর্মরত একজন মহিলা বলেন, ‘খরচে অবদান রাখার ফলে আমাদের কাজের স্বীকৃতি বেড়েছে এবং ছোটখাটো কেনাকাটার জন্য অন্যদের উপর নির্ভরতা কমেছে। উপার্জিত অর্থ থেকে যতটা না সন্তুষ্টি আসে, তার চেয়ে বেশি আসে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারার অনুভূতি থেকে।’
গবাদি পশুর মালিকরাও এই ব্যবসা প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছেন। স্টার্টআপটি প্রতি কেজি প্রায় ১০ টাকা দরে গোবর কেনে এবং দেশি গরুর গোবরকে অগ্রাধিকার দেয় যা তাদের গুণগত মান পূরণ করে। এই কেনাকাটা গবাদি পশুর মালিকদের জন্য আয়ের একটি অতিরিক্ত উৎস তৈরি করেছে, এমনকি যারা দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া গরুর যত্ন নেন তাদের জন্যও এই সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, হস্তশিল্পের এই ব্যবসার একটি অপরিহার্য অংশ ক্রেতা খুঁজে বের করা। তাই অনলাইন চ্যানেলের মাধ্যমে বিক্রি করার পাশাপাশি বড় বড় মেলা ও প্রদর্শনীতে স্টল স্থাপন করেও বাজার তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখানে গ্রাহকরা কেনার আগে পণ্যগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এছাড়া এখন শহরের বড় বড় মল এবং প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে এখন পণ্য সরবরাহ করার জন্য কাজ করছে। পণ্যের সহজলভ্যতা বাড়ানো এবং গ্রাহকদের পছন্দের প্রতি সাড়া দেওয়া সেই প্রচেষ্টারই অংশ। আপাতত, উৎপাদন মূলত প্রদীপ এবং সাজসজ্জা মেটানোর উপরই কেন্দ্রীভূত। গোবর এবং মাটি দিয়ে তৈরি এই পণ্যগুলি প্রাকৃতিক উপকরণে আগ্রহী গ্রাহকদের জন্য একটি বিকল্প হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। রোশন বলেন, ‘এগুলি গ্রামীণ মহিলাদের পরিচিত উৎসব এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত জিনিসগুলিতে তাদের দক্ষতা প্রয়োগ করার সুযোগও দেয়।’
সূত্র : ইটিভি ভারত (ETV Bharat)


