নোটন কর
ধর্মতলায় ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেফতার করা হলো ১১ জনকে। গত শুক্রবার ওই মিছিল ঘিরে হঠাৎ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত শুরু হয় ধর্মতলার মোড়, ডোরিনা ক্রসিং চত্বরে।আন্দোলনকারীরা পুলিশের দেওয়া অনুমতি অনুযায়ী মিছিল রানী রাসমণি রোডে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয়। হঠাৎ পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে, পাল্টা পুলিশের দিকে জুতো-বোতল ছোড়া হয়। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিগ্রহের শিকার হন বেশ কয়েকজন গোদি মিডিয়ার সাংবাদিক। শুক্রবারই মুখ্যমন্ত্রী হুংকার দিয়ে বলেন, ধর্মতলার মিছিল থেকে যাঁরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে গুন্ডাদমন আইনে। এমন ব্যবস্থা করা হবে যে, তিন পুরুষ মনে রাখবে! মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সব মিলিয়ে ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁরা ছাত্রও নন এবং তাঁদের সঙ্গে নিট-আন্দোলনের কোনও যোগও নেই। এরা রাজাবাজার, খিদিরপুর, পার্ক সার্কাস, গার্ডেনরিচ ইত্যাদি এলাকা থেকে এসেছে। এদের ককরোচ বলেও অভিহিত করেন মুখ্যমন্ত্রী। এও বলেন, এই জঙ্গিপনার নেপথ্যে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাম, অতিবাম, সিজেপির কর্মসূচিতে যারা ভোটে হেরেছেন তারা লোক পাঠিয়েছিলেন। শনিবার বিকেলের মধ্যেই পুলিশ ১১ জনকে আটক করে। মধ্যমগ্রাম বাদু এলাকা থেকে পুলিশ এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ, তিনি মিছিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিতে অগ্নিসংযোগ করেছিলেন। প্রশ্ন হল, দেশে কোনদিন থেকে মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো বেআইনি হল?
গত শুক্রবারের মিছিলে পুলিশ ও গোদি মিডিয়ার সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘাতকে ‘বিজেপির কাজ’, ‘ছাত্র নয়’, ‘মিছিলের কেউ নয়’ দাবি করে সংসদীয় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি বিশেষকরে এসএফআই, এআইডিএসও গ্রেফতার হওয়া আন্দোলনকারীদের বিপদের মুখে ফেলেছে। এই সংসদীয় ছাত্রদলগুলোর কি মনে হয়, এই ৭০ জন বিজেপির লোক! আর বিজেপি নিজের লোকেদের উপর গুন্ডা দমন আইন প্রয়োগ করবে? শুক্রবারের ঘটনাকে নিন্দা করে
শনিবার বিধানসভায় একমাত্র বামপন্থী বিধায়ক বিজেপির সঙ্গে মিছিলে হাঁটলেন। বিজেপির দেওয়া কালো ব্যাজ পরলেন। দাবি তুললেন শাস্তির এবং গুন্ডা দমন আইনের বিরোধিতা করলেন না। মিছিলের অন্যতম আয়োজক, এসএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক, দেবাঞ্জন দে’র অভিযোগ, ‘গুন্ডা ঢুকিয়ে মিছিল বানচাল ও কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। শাসকদল, তাদের মদতপুষ্ট কিছু বিধায়ক, যাঁরা কোন দলে থাকবেন ঠিক করতে পারছেন না, তাঁদের বাহিনী এবং পুলিশ-প্রশাসনের লোকজন মিছিলে ঢোকার চেষ্টা করেছেন।’
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন,, ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ‘এজেন্ট প্রোভোকেটর’ হিসেবে ঢুকে কেউ কেউ ছাত্র আন্দোলনের গরিমাকে নষ্ট করতে চেয়েছে। সাংবাদিকদের উপরেও হামলা হয়েছে, যা তীব্র নিন্দাজনক। মুখ্যমন্ত্রী এর সুযোগ নিচ্ছেন’। গোদি মিডিয়া কর্পোরেট ও বিজেপি আরএসএস-এর খবর প্রচার করে। তার মানে এই নয় যে, তাদের ধরে ধাক্কাধাক্কি করতে হবে। ওটা নিন্দাজনক। ব্যাস ওইটুকুই। বামদের কাছে এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল নিঃসন্দেহে। খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার, এর চেয়ে অনেক বড় বড় হিংসার ঘটনা গোটা দেশ জুড়ে এই আন্দোলনে ঘটেছে এবং সরকারপক্ষ একতরফাভাবে তা ঘটিয়েছে, গোদি মিডিয়া এসব দেখতে পায়নি। গত শুক্রবার মিছিলে মৌলালী মোড়ে বিজেপি আরএসএস ফ্যাসিষ্ট বাহিনী দমকল গাড়ির মাথায় চড়ে মিছিলে ইট ছুঁড়েছে। মিছিল যাবার সময় মৌলালী যুবকেন্দ্র থেকে ইট পাটকেল ছোঁড়া হয়েছে সেখানে বিজেপির কর্মী সভা চলছিল।
দিল্লির যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে জুনেইদ বলে একটি ছেলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিল। অভিযোগ, বহুদূরে উত্তরপ্রদেশে তার বাড়ির লোক, এমনকি বোনের শ্বশুরবাড়ির লোককেও পুলিশ পাকড়াও করেছে, স্রেফ সাম্প্রদায়িক জিগির দেবার জন্য। বিহারে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ খোলা বন্দুক হাতে গুলি চালিয়েছে। দিল্লিতে পেলেট গানে আহত করেছে ছেলেমেয়েদের। পুলিশ নানাভাবে মেয়েদের উপর শারীরিক নির্যাতন করেছে। এসব ছেড়ে দিয়ে, কোথায় সাংবাদিক নামধারীকে হেনস্থা করা হয়েছে, তাও খালি হাতে, নিঃসন্দেহে সেটাও অনুচিত কাজ, কিন্তু তার গুরুত্ব বেশি হয়ে গেল? বিরোধীদের উপর ডিম-পাথর ছোঁড়াকে গোদি মিডিয়া ‘জনরোষ’ বলে চালিয়েছিলেন, সাংবাদিকতার নাম করে ন্যক্করজনক ভূমিকা পালন করেছেন, সেসব কী ভুলে যেতে হবে নাকি? গ্রেফতার হওয়া যুবকদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে তারা ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলনের সমর্থনে এসেছিলেন। ‘তাঁরা আমাদের লোক নয় বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া চলবে না’। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ছাত্রদের যে আলোচনা হয়েছে, তাতে শর্ত আছে, আন্দোলন সংক্রান্ত সমস্ত এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে। তার মধ্যে সেদিনের মিছিলের এফআইআরও আছে। অথচ রাজ্য সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুসরণ করছে না।
মুখ্যমন্ত্রী গুন্ডা দমন আইনের কথা বলেছেন। এটা আসলে গুন্ডা নয়, এই আইনের মাধ্যমে গণ আন্দোলন, তার নেতৃত্ব ও কর্মীদের দমন করা হবে। ছাত্র আন্দোলনে যে সংহতি দেখা দিয়েছে তা দমন করা হবে। আগামীদিনে বিভিন্ন গণ আন্দোলন গড়ে ওঠবে সেগুলো দমন করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী যে যে এলাকার নাম করেছেন, সেখানে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। তিনি ‘শুক্রবাড়ি’ ওয়ালাদের কথা বলেছেন। অথচ শুক্রবারের মিছিলে গোটা রাজ্য থেকে জাতিধর্ম নির্বিশেষে ছাত্র-যুব সহ সব বয়েসের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। সেই মিছিলে বিশেষ বিশেষ এলাকার মানুষের অংশগ্রহণকে অন্য চোখে দেখা হচ্ছে, এইভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক জিগির তোলা হচ্ছে। বারুইপুর কান্ডে মুখ্যমন্ত্রী ও তার দল এই জিগির তুলেছিল। সেখানে এই আইনের বলে একজন অভিযুক্তকে ‘এনকাউন্টার’-এ হত্যা করা হয়েছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যেন শাসকশ্রেণীর তৈরি করা এই ফাঁদে না পড়ি। আমাদের গণ আন্দোলন ও প্রতিবাদকারীদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।


