মানসিক রোগীদের ভালোবাসা, সম্মান এবং সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করাই হলো মানবিক দীপাবলি

ওয়েব ডেস্ক : দীপাবলির প্রাক্কালে প্রদীপ, লন্ঠন এবং উৎসব সামগ্রী তৈরি করছেন থানের মানসিক হাসপাতালের রোগীরা। চিকিৎসকদের দাবি, এর ফলে ওই রোগীদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে ও তাঁরা আত্মনির্ভরশীল হবেন। সেই সঙ্গে নিজেদের সৃজনশীল কাজের দক্ষতার স্বীকৃতিও পাবেন তাঁরা। প্রচলিত চিকিৎসালয়ের গণ্ডির বাইরে গিয়ে এই মানসিক হাসপাতাল নিরাময় এবং সৃজনশীলতার এক পরিসরে রূপান্তরিত হয়েছে। দিওয়ালির আগে একটি বিশেষ অকুপেশনাল থেরাপি উদ্যোগের মাধ্যমে, রোগীরা তাদের ভেতরের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উৎসবের নানা সামগ্রী তৈরি করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবলমাত্র ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ক্ষমতায়ন এবং মানবিক সংযোগের মতো অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। রোগীরা ১,০০০-এরও বেশি প্রদীপ, লণ্ঠন এবং সজ্জাসামগ্রী তৈরি করেছেন বলে খবর। হাসপাতালের অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগটি এখন কর্মচাঞ্চল্যে মুখরিত। রোগীরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে ১,০০০-এরও বেশি মাটির প্রদীপ (দিয়া) ডিজাইন ও রঙ করেছেন, যার মধ্যে ময়ূর এবং পদ্ম-থিমের প্রদীপও রয়েছে। এর পাশাপাশি তারা ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠন (আকাশকণ্ডিল), দরজার সজ্জাসামগ্রী (তোরণ), সুগন্ধি ভেষজ স্নানের পাউডার (উটানা), ফুলের সলতে, সুগন্ধি মোমবাতি এবং উলের রঙ্গোলিও তৈরি করেছেন। মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডঃ নেতাজি মুলিকের পরিচালনায় শুধুমাত্র মহিলা বিভাগের রোগীরাই ৫০০ প্যাকেট ভেষজ বডি স্ক্রাব, আলংকারিক তোরণ এবং অনন্য রঙ্গোলি তৈরি করেছেন।

মানসিক চিকিৎসায় মর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম

নাগরিকদের কেনার জন্য এই হস্তনির্মিত পণ্যগুলি একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করা হয়েছে। উৎসবের আমেজের বাইরেও, এই উদ্যোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাগত উদ্দেশ্য পূরণ করবে। পাশাপাশি, তাঁদের কাজের উপার্জনের মাধ্যমে রোগীদের মধ্যে কৃতিত্বের অনুভূতি, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং আর্থিক আত্মনির্ভরশীলতাও প্রদান করবে। এছাড়াও হাসপাতাল প্রাঙ্গণটি রোগীদের তৈরি করা লণ্ঠন, ব্যানার এবং তোরণ দিয়ে সজ্জিত করা হবে।
এই সৃজনশীল কর্মসূচিগুলোর গভীর নিরাময়কারী প্রভাবের কথা তুলে ধরে মানসিক চিকিৎসায় মর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন
হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডঃ নেতাজি মুলিক। তিনি বলেন, ‘অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে আমাদের প্রধান প্রচেষ্টা হলো রোগীদের আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের নতুন উদ্দেশ্যবোধে সজ্জিত করা। যখন নাগরিকরা এই হস্তনির্মিত জিনিসগুলো কেনেন এবং এর প্রশংসা করেন, তখন তা তাদের দক্ষতার স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের মধ্যে অপরিসীম আত্মসম্মানবোধ তৈরি করে। রোগীদের ভালোবাসা, সম্মান এবং সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করাই হলো মানবিক দীপাবলি উদযাপনের প্রকৃত সারমর্ম।’ এই দীপাবলি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে ডঃ সুধীর পুরী, ডঃ জানভী কারজারকর এবং ডঃ আশ্লেষা কোলির নেতৃত্বে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং হাসপাতালের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও প্রশাসনের সহায়তায়। নাগরিকরা যখন এই উৎসবের সৃষ্টিগুলো কিনতে আসবেন, তখন এই উদ্যোগটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সহানুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সংবেদনশীলতার এক শক্তিশালী বার্তা দেবে—যা প্রমাণ করবে যে, সহানুভূতি যখন পথ দেখায়, তখনই প্রকৃত সামাজিক নিরাময় ঘটে।

থানে মানসিক হাসপাতালের যে ছবি উঠে এসেছে তা দেখার মতো। একাগ্রতার সঙ্গে রোগীরা প্রদীপগুলো নিয়ে কাজ করেছে। কাউকে কাউকে ময়ূর ও পদ্ম আকৃতির প্রদীপ রঙ করতে দেখা গিয়েছে, আবার অনেকে উল দিয়ে কাগজের লণ্ঠন, দরজার ঝালর এবং রঙ্গোলি তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে। এছাড়াও দেখা গিয়েছে ম, যেভাবে তাঁরা প্রদীপগুলো ধরে রং করছে এবং যত্ন সহকারে তুলির আঁচড় দিচ্ছে, তা দেখে বিশ্বাসই হবে না যে, তাঁরা থানের আঞ্চলিক মনোরোগ হাসপাতালের রোগী। তাঁরা অসুস্থতার কারণে সেখানে ভর্তি হয়েছে। তাঁদের মুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট; রোগীদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা দিওয়ালির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কারণ তাদের তৈরি করা লণ্ঠন, তোরণ এবং সজ্জা শুধু দিওয়ালির রাতে তাদের ওয়ার্ডকেই সুন্দর করবে না, বরং আরও অনেক ঘরবাড়িকেও আলোকিত করবে। প্রসঙ্গত, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান যে, তাদের এই কাজগুলো ১ নভেম্বর থেকে একটি দিওয়ালি প্রদর্শনীতে বিক্রি করা শুরু হয়েছে এবং এই প্রদর্শনী চলবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত।

সূত্র : ফ্রি প্রেস জার্নাল (freepressjournal.in) /ইটিভি ভারত (ETV Bharat)

91 Views