ওয়েব ডেস্ক : কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে সব ধরনের আইন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং যুবকরা যদি কোনও রাজনীতিবিদের পদত্যাগ দাবি করে, তবে তাদের এফআইআর এবং লাঠিচার্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বলেছেন দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এপি শাহ।

প্রয়াত বিচারপতি এইচ আর খান্নার স্মরণে গোয়া হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত বার্ষিক বক্তৃতা সিরিজের দ্বিতীয় সংস্করণে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুক্রবার বিচারপতি এপি শাহ বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট এই ধারণাকে সমর্থন করেছে যে, বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং মুক্ত রাজনৈতিক আলোচনা জনশিক্ষাকে সহজতর করে ও আদালতের সুষ্ঠু কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন মতামতের গুরুত্ব, সম্মান এবং সহনশীলতার ওপর আলোকপাত করেছে।’

তিনি বলেন, সমালোচনার মোকাবিলা করার সর্বোত্তম উপায় হলো চুপ করিয়ে দেওয়া নয়, বরং বক্তার সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হওয়া এবং তাঁর জবাব দেওয়া। ‘কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাবানরা আজ এই বিষয়টি ভুলে গেছেন বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, আজ আন্দোলনকারী, ভিন্নমতাবলম্বী, রাজনৈতিক কার্টুনিস্টদের কণ্ঠরোধ করতে এবং হয়রানি করার জন্য সব ধরনের আইন ও হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, যদি একদল তরুণ জবাবদিহিতার দাবিতে কোনও রাজনীতিবিদের পদত্যাগ চায়, তবে তাদের ফৌজদারি এফআইআর এবং লাঠিচার্জের মুখে পড়তে হয়। অন্য ক্ষেত্রে, কেউ একজন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানের কথা ভুল শোনে…এটা খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ এতে ক্ষুব্ধ হয়, এবং পরক্ষণেই দেখা যায় কমেডিয়ানটি জেলে। এমনকি আপনি যদি এমন কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজকও হন যেখানে এই ধরনের কমেডিয়ানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, আপনাকেও জেলে পাঠানো হয়। আপনার জেল থেকে বের হতে সপ্তাহ, এমনকি মাসও লেগে যেতে পারে।

দেশজুড়ে নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, ‘নিটের মতো নির্দিষ্ট পরীক্ষার প্রতি অভিযোগের চেয়েও অনেক বড়’ এই আন্দোলন। তিনি বলেন, ‘তারা গণতান্ত্রিক শক্তির পুনরুজ্জীবনের প্রতীক। বছরের পর বছর ধরে অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, ভিন্নমত বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সুশীল সমাজ ক্লান্ত, রাজনৈতিক বিরোধীরা অকার্যকর এবং সমালোচনার পরিসর স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে… এই তরুণ নাগরিকরা দেখিয়েছেন যে ভারতে গণতান্ত্রিক চেতনা এখনও ব্যাপকভাবে সজীব, প্রতিবাদগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ… এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য ছিল যুক্তিসঙ্গত দাবি’। বিচারপতি শাহ বলেন, রাস্তা, আদালত এবং সংসদ সবই একটি সমাজের পরিপূরক স্তম্ভ। ‘বিচারকদের বীরত্বপূর্ণ কর্মী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের কেবল আইনের শাসন, স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে নিজেদের কাজ করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’

তিনি বলেন, বুলডোজার রাজনীতি এবং এনকাউন্টার কিলিংয়ের মতো বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির ব্যবহার আইনের শাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ‘আজ বুলডোজার হলো আইনি অনুমোদন ও কর্তৃত্ব ছাড়াই ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতীক। এখানে রাষ্ট্র একাধারে তদন্তকারী, অভিশংসক, বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করে এবং আক্ষরিক অর্থেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর বিনা বিচারে গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজার ব্যবহার করে। এই ধ্বংসযজ্ঞের বাইরেও, পুরো পরিবার ও সম্প্রদায়ের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। যদি আইনের শাসনকে বুলডোজার, এনকাউন্টার স্কোয়াড এবং সরকারি কমিশন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, তাহলে আদালত এবং বিচারকদের ভূমিকা কী?’ প্রশ্ন করেন তিনি।

বিচারপতি শাহ বলেন, ‘যখনই সরকার নিজের প্রতি কোনও হুমকি অনুভব করে’, তখনই নাগরিকদের নিয়মিতভাবে মৌলিক যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এমনকি দিল্লিতেও সম্প্রতি কিছু সময়ের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল… সম্মিলিতভাবে, এই সবকিছু একটি কৌশল এবং রাষ্ট্র-একচেটিয়া আলোচনার দিকে একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করে। আজ বাকস্বাধীনতার উপর একটি ভীতিকর প্রভাব রয়েছে, এবং দুর্ভাগ্যবশত, আদালতগুলোও দ্রুততার সাথে এগুলোর শুনানি করতে অনিচ্ছুক।’

সৌজন্যে : পাভনীত সিং চাড্ডার প্রতিবেদন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (Written by: Pavneet Singh Chadha, Aug 1, 2026, indianexpress.com)

89 Views