সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়াজ উঠছে, আর চাই না গুগল-জুম, ফিরিয়ে দাও ক্লাসরুম

ওয়েব ডেস্ক : সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে স্কুল খোলার দাবিতে সরব হয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। গত দিনসাতেক ধরে অনেকেই ফেসবুকে লিখছেন, আর চাই না গুগল-জুম, ফিরিয়ে দাও ক্লাসরুম। করোনা অতিমারি পরিস্থিতিতে গত দেড়বছরেরও বেশি সময় বন্ধ রাজ্যের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন পাঠন। মাঝে কিছু সময়ের জন্য মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের দাপটে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষা প্রায় চুলোয় গেছে। শিক্ষাঙ্গনের বাইরে থেকে শিশু কিশোরদের বিভিন্ন রকম মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে শুরু করেছে। সরকার অনলাইনে পঠন পাঠনের ব্যবস্থা করলেও এদেশে তার সুবিধা নিতে পারছে না বিপুলসংখ্যক পড়ুয়া। সমাজের প্রান্তিক অংশের মধ্যে থাকা পড়ুয়াদের অনেকেই অন্য কাজে ঢুকে পড়েছে। নাবালিকা বিয়ে বেড়েছে। শিক্ষা জগৎ হারিয়ে পড়ুয়ারা দিশাহারা পড়ছে। আর অন্যদিকে, লকডাউনের ফলে কাজ হারিয়েছেন অগণিত মানুষ। বহু মানুষ পেশা বদল করে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভিন্ন মতও উঠে আসতে শুরু করেছে। লকডাউন বিরোধী গণ উদ্যোগের মতো নাগরিক সংগঠন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়-সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃশর্তে খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। এই সংগঠন আগামী ২৭ মার্চ বিকাশ ভবন অভিযানের ডাক দিয়েছে।

জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকেও শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। সম্প্রতি সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষাল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গতবছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও আমার ছেলে স্কুল যেতে না পারার জন্য মন খারাপ করত, এখন স্কুল যাওয়ার কথা মুখেও আনে না, জিজ্ঞাসা করলে বলে, নাহ আর ইচ্ছে করে না। বাড়ি থেকে বেরোতেও আর ইচ্ছে করে না। ইচ্ছেগুলো কমে আসছে ওর। শখ-আহ্লাদও শুকিয়ে যাচ্ছে। কত বড় সর্বনাশ যে ঘটে গেল এই ছেলে-মেয়েগুলোর! ওরা কী মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে, কৈশোরে পৌঁছচ্ছে আমি জানি না। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, খেলা নেই, মারামারি ঝগড়া নেই, গোপন আলোচনা নেই, আবোলতাবোল বকা নেই! অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। অভিভাবক হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এ কী পৃথিবী দেব বলে ওকে নিয়ে এলাম!’ পাশাপাশি এক শিক্ষক লিখেছেন, ‘প্রায় প্রতিদিন স্কুলে বেরনোর সময় ছোট্ট মেয়ে সমাপ্তি ওর দিদির স্কুল ড্রেস পরে কাঁদতে থাকে, ‘আমিও স্কুলে যাব।’ ওকে প্রায় লুকিয়ে আমাকে স্কুলে যেতে হয়। আজ স্কুল থেকে ফিরে দেখি ‘আমারও স্কুল ড্রেস চাই’, ‘আমিও স্কুল যেতে চাই’ প্লাকার্ড হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছি দিদি অনু লিখে দিয়েছে। কিন্তু একজন বাবা ও শিক্ষক হিসেবে ওইটুকু বাচ্চার যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু স্কুল খোলা নেই। ওর কান্না আর রাগ আমাকে অন্য কোনও উপায়ে মেটাতে হচ্ছে। (কখনও চকলেট, কখনও কেক, কখনও ঘুরতে নিয়ে যাওয়া।) আমিও চাইছি অন্তত বাচ্চাদের স্কুল খুলে যাক।’

ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি লিখেছেন, ‘অবিলম্বে স্কুল কলেজ সহ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিঃশর্তে খোলার দাবি উঠুক। একমাত্র দেশ ভারতবর্ষ, যেখানে সবচেয়ে বেশিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ‘এগিয়ে বাংলা’ মনে হয় এব্যাপারে ভারতের মধ্যেও এগিয়ে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। নেই শিক্ষামন্ত্রীর কোনো উচ্চবাচ্য। দুএকটা জায়গায় বিক্ষিপ্ত ভাবে স্কুল খোলার দাবি ইদানিং চোখে পড়ছে। কিন্তু সেগুলো সরকারের কানে জল ঢোকানোর জন্যে একেবারেই যথেষ্ট নয়। একদম প্রাথমিক স্তর থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এখনই খোলা দরকার। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন রাস্তায় নামা। দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে এসে শিক্ষক, অভিভাবকদের উচিৎ শিক্ষার দাবিতে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে, অন- লাইন অ্যাপ- নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলা। কোভিড পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে যে ভাবে শিক্ষার অধিকার সংকোচনের সর্বনাশা আয়োজন চলছে তা যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করাই সময়ের দাবি। এই দাবি নেহাতই সামাজিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা উচিৎ তাই নয়, এই দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও যথেষ্ট জোরালো। এটা প্রমাণিত যে ওমিক্রণ তো নয়ই, এমনকি গোটা কোভিড কালে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা করোনাক্রান্ত প্রায় হয়ইনি, গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বলে এই সংখ্যাটা শুন্য। গোটা ভারতবর্ষে এই বয়সের ছেলেমেয়েদের মৃত্যুর সংখ্যাটাও হাতে গোনা( খুব গুরুতর কোমর্বিডিটি ছাড়া)। আর ওমিক্রণ ভ্যারাইটি তো প্রাকৃতিক ভ্যাকসিন। দ্রুত সংক্রমিত হয় কিন্তু মারণ ক্ষমতা নেই। মূলধারার প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করে আতঙ্কের যে রাজনীতি চলছে তার বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজকে সরব হতেই হবে। শিক্ষার এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শুধু নয়, আমাদের মতো শিক্ষাজীবীদের স্বার্থেও। আগামী প্রজন্মের তলিয়ে যাওয়া রুখতে পারি আমরাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে যদি এখনও বিবেকের ডাকে সাড়া না দিতে পারেন শিক্ষক সমাজ, তবে অদূর ভবিষ্যতে, কাজ হারানো, খেতে না পাওয়া মানুষের কাছে রাস্তাঘাটে একথা শুনতেই হবে, ‘পাবলিকের ট্যাক্সের পয়সায় কোনো পাবলিক সার্ভিস না দিয়ে বাড়ি বসে মাইনে নিতে লজ্জা করে না!’ এখনো সময় আছে, বাঁচতে ও বাঁচাতে চাইলে সরকারি নির্দেশের অপেক্ষার অপযুক্তি নয়, নিজের বিবেকের তাড়নায় পথে নামুন, প্রতিবাদ করুন এই মানুষ মারা লকডাউনের।’

দেবশ্রুতি মিত্র, মৌমিতা চক্রবর্তী, তাপসী চৌধুরী মিত্র, হিমিকা মুখার্জি, শ্রীকান্ত আচার্য-সহ বেশ কয়েকজন অভিভাবক সোশ্যাল মিডিয়ায় এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। সেখানে ‘ওপেন স্কুল কলেজ ইউনিভারসিটিজ’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যতদিন না গর্জে উঠব, ততদিন সুরাহা হবেনা। অভিভাবক হিসেবে বলছি, এবার মনে হয় গর্জে ওঠা দরকার প্রত্যেক অভিভাবকের। আমার সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট করে দিচ্ছে। মা/বাবা হিসেবে সন্তানের এতো বড়ো ক্ষতিতেও যদি আওয়াজ না তুলি তাহলে তো মা/বাবা হওয়ার যোগ্য নই। ভীষণ ভাবে দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে ইউনিভার্সিটি, কলেজ, স্কুল খোলা হোক। করোনার গল্প অনেক হোলো … ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে আর খেলবেন না। তাদের ভালো ভাবে থাকার রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়ে যাবেন না। যদি একমত হন, তাহলে কপি পেস্ট করে নিচে নিজের নাম যুক্ত করে পোস্টটা এগিয়ে নিয়ে যান, ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না টনক নড়ে।’ আবার অনেকেই ফেসবুকে লিখছেন, ‘চাইছি না আর গুগল মিট-জুম, ফিরিয়ে দিন মোদের ক্লাসরুম। দিকে দিকে আওয়াজ তুলুন, মাননীয়া স্কুলটা খুলুন।’ দাবি উঠছে, ‘খুলে দাও, সব খুলে দাও। মিথ্যা প্রচার ও আতঙ্ক ছড়ানোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। মারণ রোগ নয়, অতিমারি মহামারীও নয়। করোনা একটি ছোঁয়াচে অসুখ। তার প্রতিরোধে যা করার সেটুকুই করো। অন্যান্য আসল সব মারণ রোগ – ক্যান্সার, টিবি,অপুষ্টি, আন্ত্রিক, সুগারের কিডনির অসুখ, লিভারের অসুখ, পেটের অসুখ – এসবের চিকিৎসা করো ঠিক করে। স্কুল খোলো, কলেজ খোলো, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলো। জানা গেছে, মানুষের ক্ষোভের আঁচ পেয়ে স্কুল খোলার চিন্তাভাবনা শুরু করেছে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতর। প্রাথমিক ভাবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল খোলার প্রস্তাব দিয়ে মুখ্যসচিবকে চিঠিও দিয়েছে বলে খবর। এই প্রস্তাব বিশেষজ্ঞ কমিটি খতিয়ে দেখে মত দিলে স্কুল খোলা হবে বলে জানা গেছে। মহারাষ্ট্র সরকার সে রাজ্যের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী সোমবার খুলে দিচ্ছে। আর এ রাজ্যে স্কুল খোলার দাবিতে মানুষের ক্ষোভ ক্রমশই বাড়ছে।

ওয়েব ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Next Post

হাতির হানায় ক্ষতিগ্রস্ত মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র

Sun Jan 23 , 2022
সুকুমার রঞ্জন সরকার, আলিপুরদুয়ার বুনো হাতির হানায় ক্ষতিগ্রস্ত আলিপুরদুয়ার ২ নম্বর ব্লকের নুরপুর শফিকুল মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার গভীর রাতে পানবাড়ি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে দুটো হাতি ওই মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের রন্ধনশালায় হানা দেয়। রন্ধনশালার দেওয়াল ভেঙ্গে পড়ুয়াদের মিড- ডে মিলের জন্য রাখা কিছু চাল ও অন্যান্য সামগ্রী সাবাড় করে ফের […]