নোটন কর

সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাসাত জেলা পরিষদ ভবনের তিতুমীর নামাঙ্কিত সভাঘরটির নাম পাল্টে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কক্ষ করেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ২৬ জুন। তার আগে ২৪ পরগনা ছিল অবিভক্ত জেলা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জেলা পরিষদের ওই সভাকক্ষ ‘তিতুমীর সভাকক্ষ’ নামে পরিচিত। বাদুড়িয়ার বাসিন্দা তিতুমীর, যাঁর প্রকৃত নাম সৈয়দ মীর নিসার আলি। ঊনবিংশ শতকের বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত নেতা ছিলেন তিনি। জমিদারদের অত্যাচার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। নিজের বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় তৈরি দুর্গ থেকেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই দুর্গই ‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’ নামে পরিচিত হয়।

সৈয়দ নিসার আলি তিতুমীর বাংলারই ভূমিপুত্র। ইতিহাস সচেতন ও শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন, সৈয়দ নিসার আলি তিতুমীর ব্রিটিশ নীলকরদের জুলুম, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং ব্রিটিশদের সহযোগিতায় স্থানীয় জমিদাররা বাংলার কৃষকদের উপর যে নির্মম অত্যাচার করতেন, তা বন্ধ করার জন্য বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়া ব্রিটিশ শাসন থেকে বাংলাকে মুক্ত করার জন্য কৃষকদের সংগঠিত করছিলেন তিনি। এই প্রসঙ্গে ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী আন্দোলনে বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলন ও তিতুমীরের ভূমিকা সংক্ষিপ্তভাবে দেখে নেওয়া যাক। ‘ওয়াহাবী’ কথার অর্থ হল ‘নবজাগরণ’। ভারতে এই আন্দোলনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। ভারতে এই আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলির অধিবাসী সৈয়দ আহমেদ। বাংলাদেশে ওয়াহাবী আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন মীর নিসার আলি বা তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১ খ্রীঃ)। তিনি চব্বিশ পরগণার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্ভুক্ত হায়দারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঊনচল্লিশ বছর বয়সে মক্কায় হজ করতে গিয়ে তিনি সৈয়দ আহমেদের সংগে পরিচিত হন ও ওয়াহাবী আদর্শ গ্রহণ করেন। অসাধারণ সংগঠন শক্তির অধিকারী তিতুমীর সুদখোর মহাজন, নীলকর ও জমিদারদের হাতে নির্যাতিত দরিদ্র হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের নিয়ে এক বিরাট সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁর আন্দোলনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জমিদার ও নীলকর সাহেবরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। জমিদার ও নীলকরদের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ বাধে। জমিদার, নীলকর ও সরকার তাঁর বিরুদ্ধে সমবেত হয়। তাঁরা একযোগে ওয়াহাবীদের ওপর নানা রকম অত্যাচার করতে থাকে।

তিতুমীর বলেছিলেন পির পয়গম্বরকে মান্য করার জন্য মসজিদ, দরগা নির্মাণের প্রয়োজন নেই। তিনি তাঁর অনুগামীদের দাড়ি রাখার ও লুঙ্গির মতো করে ধুতি পরার নির্দেশ দেন। তাঁর শক্তিশালী আন্দোলন অচিরেই চব্বিশ পরগণা, নদিয়া, ঢাকা, রাজশাহি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে আন্দোলন দুর্বল করার জন্য পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় নানারকম কর আরোপ করে। জমিদার তিতুমীরের অনুগামীদের দাড়ির ওপর আড়াই টাকা জরিমানা ধার্য করেন। জমিদারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে তাঁর অনুগামীরা পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের রাজবাড়ি আক্রমণ করে।
তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তৎপরতার খবরে বাদুড়িয়ার দশ কিলোমিটার দূরে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিনি একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। দেখা গেছে, ব্রিটিশদের উন্নতমানের কামান, বন্দুক ইত্যাদির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য তিতুমীর তাঁর যে সামর্থ আছে তাই দিয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিজে বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করে মৈনুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী ও গোলাম মাসুমকে সেনাপতি নিয়োগ করে সেখানে একটি স্বাধীন দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। টাকি, গোবরডাঙ্গা প্রভৃতি স্থানের জমিদারদের কাছ থেকে কর দাবি করতে শুরু করেন। স্বভাবতই স্থানীয় জমিদারবর্গ, নীলকররা এবং কোম্পানীর পক্ষে এ সব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। গভর্ণর লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক-এর আদেশে ১৮৩১ খ্রি. ১৯ নভেম্বর ইংরেজ সেনার গোলাবারুদের আঘাতে তাঁর বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান। ইতিহাসে এটি ‘বারাসাত বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। তাঁর কয়েকজন অনুগামী বীরের মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। বন্দী সৈন্যদের ফাঁসি হয় এবং অনেকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ভোগ করেন।
তিতুমীর জানতেন, ইংরেজ ও জমিদারদের যৌথ শক্তির কাছে তাঁরা হয়তো পেরে উঠবেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ও তাঁর অনুগামীরা অকুতোভয়ে লড়েছেন এবং নিজের জীবন দিয়েও তাঁরা জুলুম, নির্যাতনের প্রতিরোধ ও ব্রিটিশদের বাংলা থেকে তাড়াতে চেয়েছিলেন।

তিতুমীর পরিচালিত বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কুমুদনাথ মল্লিক, বিহারীলাল সরকার একে হিন্দু বিরোধী ধর্মোন্মাদদের কাজ বলে অভিহিত করেছেন। একে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলে চিহ্নিত করেছেন ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, শশীভূষণ চৌধুরি অন্যদিকে উইলিয়াম হান্টার, স্মিথ, থর্নটন, কেয়ামুদ্দিন আহমেদ, নরহরি কবিরাজ প্রমুখ একে দরিদ্র কৃষকদের শোষক জমিদার-সরকার বিরোধী আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে মুসলমান জমিদারদের বিরুদ্ধেও আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ যে সময় ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি দর্বল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় তিতুমীর এই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেছেন। যা অবশ্যই ইতিহাসে তাঁকে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একথা ঠিক যে, ওয়াহাবী আন্দোলন দরিদ্র হিন্দু-মুসলিমদের সমর্থন পেয়েছে, হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জমিদারই তাদের শত্রু ছিল এবং এই আন্দোলন ইংরেজ সরকারের ভিত্তিমূলে প্রবল আঘাত হেনেছে। বাংলার ভূমিপুত্র তিতুমীর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে নজির রেখেছিলেন তা পরবর্তীতে বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন।

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী

123 Views