দিলীপ রায়

ধ্বংসের পথে ভারতীয় গণতন্ত্র। কেন্দ্রের মোদি সরকার সেই পথেই ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার গণতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভকে ক্রমশ ধীরে ধীরে দূর্বল করেছে। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ আইনসভাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য প্রয়োজন মতো নতুন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে। ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে তিনজনের নিয়োগ প্যানেল থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে সেখানে নিজের মন্ত্রিসভার একজনকে ঢুকিয়েছে। অর্থাৎ এই প্যানেলের মাধ্যমে শাসকদলের দু’জন ও বিরোধী দলনেতা থাকায় নির্বাচন কমিশনার পদে পছন্দের মানুষকে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে।

গণতন্ত্রের আরেক স্তম্ভ শাসনবিভাগ বা নির্বাহী বিভাগ আইনের বাস্তব প্রয়োগ না করে গণতন্ত্রের মূল শর্ত বাক স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলেই নির্মম দমন-পীড়ন নামিয়ে আনছে। সুষ্ঠু ভাবে সরকার পরিচালনা করছে না। সারা দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের অবস্থা বেহাল। শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুলবাড়ির বেহাল দশা সামনে এসেছে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ নানা অনিয়মের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় কর্মহীনের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সর্বোপরি পছন্দের নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। জেন জি প্রশ্ন তুলেছে সরকার গঠনের স্বচ্ছতা নিয়ে। এর প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে সামনে রেখে জেন জি পথে নামলে নির্বিচারে দমন নামিয়ে আনা হয়েছে। ট্রেন, মেট্রো পরিষেবা, ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ করে, পুলিশ, আধাসামরিক-সহ সবধরনের বাহিনী মোতায়েন করে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে, গুন্ডা নামিয়ে, বেআইনি আটক করে, জেন জির আন্দোলন রোখার পথ নিয়েছে মোদির শাসন। সরকারের জনবিরোধী নীতির ফলে দেশের বিভিন্ন অংশের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। জল, জমি, জঙ্গলের অধিকার মানুষের থেকে কেড়ে নিয়ে বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছে এই সরকার। সরকারের এইসব জনবিরোধী প্রকল্পের বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন আদিবাসী প্রান্তিক মানুষ। এসবের প্রতিবাদে গড়ে ওটা আন্দোলন নির্দয় ভাবে দমন করছে মোদি সরকার।

গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচারবিভাগ নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার। কিন্তু এখন বিচার বিভাগও ক্রমশ দেশের নাগরিকদের আস্থা হারাচ্ছে। প্রধান বিচারপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। উল্লেখ্য, প্রধান বিচারপতি এক সময় যুব সমাজের একাংশকে বলেছিলেন, আরশোলা। তার থেকেই জন্ম হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলনে ব্যাপক হামলা করেছে পুলিশ। সেই হামলার ভিডিও দেখার সময় থাকেনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির। প্রসঙ্গত, নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপির প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে সামনে রেখে দেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন বিরোধী নেতারা। কিন্তু সময় দেননি তিনি। এরপর প্রশ্ন উঠেছে, এটা কি গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার? এছাড়াও, নির্বাচন কমিশনকে বারবার আড়াল করেছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। তাদের নির্দেশ সত্বেও দিল্লি পুলিশ মেট্রো স্টেশন, ট্রেন ও গণপরিবহন বন্ধ রেখে বুঝিয়ে দিয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত পুতুলে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলার করার দমও দেখাতে পারেনি সুপ্রিম কোর্ট।

বাকি রইল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম বা প্রেস। গণমাধ্যম বা প্রেস এখন সরকারের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘পাবলিক ওয়াচডগ’ বা প্রহরীর ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করছে না, বা বলা ভালো করতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশের মূলধারার অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমের মালিকানা এখন শাসকদল তথা মোদি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের হাতে চলে গিয়েছে। গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত এইসব সংবাদ মাধ্যম গোদি রক্ষার পক্ষে নির্লজ্জ ভাবে প্রচার করছে। আর ক্রমশ বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। অন্যদিকে, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম সঠিক সংবাদ তুলে আনার চেষ্টা করলে তাদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান আরও নীচে নেমে গিয়েছে। ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭ তে দাঁড়িয়েছে। গত ১০ আগস্ট জেন জির আন্দোলনে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরা ছাড়াও দেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরাও আক্রান্ত হয়েছেন।

নড়বড়ে এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় গণতন্ত্র ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে পথ দেখাচ্ছে জেন জি। জেন জির আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বিরোধীদের সোজাসুজি বলেছেন, ‘হ্যাঁ, এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি হচ্ছে। কিন্তু আপনারা লাগাতার এই নির্বাচনগুলিতে অংশ নিয়ে সেগুলিকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছেন। কোন ধরনের অস্তিত্ব টেকানোর চেষ্টা করছেন আপনারা? এই ব্যবস্থা যখন খুশি আপনাদের দুর্বল করতে দিতে পারে। । যদি সত্যি দেশের ভোট প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে রাজ্য বা ক্ষতিগ্রস্ত দল নির্বিশেষে বিরোধীদের একজোট হয়ে নির্বাচন বয়কটের মতো শক্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।’ নৈতিকতার এই রাজনীতির গুরুতর প্রশ্ন দীপকে তুললেও ক্ষমতার রাজনীতির অলিন্দে থাকায় অভ্যস্ত বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের তরফে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। দেশের রাজধানী শহরে জেন জি পথ দেখিয়েছে, গণআন্দোলনের পথ। পথে নেমেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও। ভোটাধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্র রক্ষায় ভরসা থাক গণআন্দোলনে।

82 Views