নোটন কর
আজ বাংলার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে যে, রাজনৈতিক লড়াইটা শুধু ক্ষমতায় কে থাকবে, আর কে থাকবে না, তা নিয়ে নয়। এখন এই লড়াইটা মানুষের অধিকার নিয়ে, গরিব মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে, নিজের মত প্রকাশ করার অধিকার নিয়ে। একদিকে আছে শোষণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আর অন্যদিকে আছে ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করা, বিরোধী শক্তিকে দমিয়ে রাখার চক্রান্ত আর ক্ষমতার জোরে নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। এই দুই পথের সংঘাতই আসলে বিপ্লবী বামপন্থা বনাম ফ্যাসিবাদের লড়াই।
এবছর ৪ মে, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যের সাধারণ মানুষের রুজি রুটির উপর ব্যাপক আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। হকার উচ্ছেদের নামে গরিব মানুষের উপার্জন বন্ধ করা হচ্ছে। যাঁরা রাস্তায় স্টেশনে বসে সামান্য কিছু বিক্রি করে সংসার চালান, তাঁদের কাছে এই সামান্য রোজগার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাঁদের জীবিকার ব্যবস্থা না করে লাগাতার উচ্ছেদ চলছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যাপক হামলা করছে আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপি। শারদোৎসবের সময় বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে হামলা হয়েছে, ভাঙচুর করেছে বিজেপি আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত হিন্দুত্ববাদী লুম্পেনরা। একদিকে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে, আর বহু মানুষকে নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য আবেদন করতে হয়েছে। SIR এর ফায়দা ভোটে নিয়েছে বিজেপি এবং তাদের এরাজ্যে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছে। কোনও বাংলাদেশী বা রোহিঙ্গার সংখ্যা নির্বাচন কমিশন দিতে পারেনি। বাদ পড়া নাগরিকরা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না। বহু নারী অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বাদ পড়েছেন। অনেক নাগরিককে বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সীমান্তের ওপারে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বা অবৈধভাবে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করে রাখা হচ্ছে। রাজ্যে পরপর বিচার বহির্ভূত তিনটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ক্রমশ পুলিশরাজ কায়েম হচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে বিরোধীদের ওপর ব্যাপকহারে আক্রমণ শুরু হয়েছে। জনরোষের নামে বিজেপি লুম্পেনরা মব সন্ত্রাস চালাচ্ছে। বিরোধীদের সভায় হামলা চালানো হচ্ছে। মিথ্যা মামলায় জেলে ভরা হচ্ছে। মতপ্রকাশের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। সমাজ মাধ্যম থেকে অন্যান্য প্লাটফর্মে বিরোধী কন্ঠস্বরকে দমন করা হচ্ছে। জেলে ভরা হচ্ছে।
বিজেপি-আরএসএস ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে ভাগ করা, সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচয়ের জোরে অন্যদের কোণঠাসা করা এবং বিরোধী মতাদর্শের মানুষকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ফ্যাসিবাদী রাজ কায়েম করতে চাইছে যা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। যখন এই রাজনীতির সঙ্গে দমন পীড়ন ও হিংসার অভিযোগ জুড়ে যায়, তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আরও জরুরি হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদের বিপদ শুধু এই নয় যে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়। বিপদ হল, তারা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পায়।
তাই, শুধুমাত্র পড়ে বা লিখেই এখন আমাদের দায়িত্ব শেষ হবে না। সমস্ত গণতন্ত্র প্রিয় মানুষকে জোটবদ্ধ হতে হবে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, হকারের জীবিকার প্রশ্নে, শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে, কৃষকের ফসলের দামের প্রশ্নে, ছাত্রছাত্রীর শিক্ষার প্রশ্নে, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে, জল জমি জঙ্গল রক্ষার প্রশ্নে, ফ্যাসিষ্ট বিজেপির বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলন। আর এই সংকটময় সময়ে যে রাম্বাম সংসদীয় বামেরা নানা অজুহাতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যে বাধা সৃষ্টি করছে তাদের রাজনৈতিক চরিত্রও আমাদের বুঝে নিতে হবে। আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে সংকটের সময়ে হতাশ হয়ে বসে থাকলে চলবে না। আজ বিপ্লবী বামপন্থী আন্দোলন দুর্বল হতে পারে, সংগঠনের সামনে কঠিন সময় আসতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বরং যখন গরিব মানুষের জীবিকা আক্রান্ত হয়, যখন ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মত প্রকাশ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে, যখন বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা হয়, যখন আইনের শাসন থাকে না তখনই গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।
ইতিহাস আমাদের শেখায় যে মানুষের অধিকার কখনও সহজে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকের অধিকার, আট ঘণ্টা কাজের দাবি, শিক্ষার অধিকার, নারীর অধিকার-এসবের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। নভেম্বর বিপ্লব আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। তাই আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যুক্তি ও সচেতনতা ছড়িয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ কাজে বিপ্লবী বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিতে হবে। বিপ্লবী বামপন্থা বনাম ফ্যাসিবাদ আসলে দুটো আলাদা সমাজের লড়াই। একটা সমাজে মেহনতি মানুষ নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচবে, ছাত্রছাত্রীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে, মানুষ নিজের পছন্দের বই পড়বে এবং সরকারকে প্রশ্ন করতে পারবে। আর অন্য একটা সমাজে ক্ষমতার জোরে মানুষের কণ্ঠস্বর বন্ধ করার চেষ্টা হবে। সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হবে। আমরা কোন সমাজ চাই! সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। সংকটের সময়েই বিপ্লবী বামপন্থা বেশি বেশি করে মানুষের আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ায়, তাকে নেতৃত্ব দেয়। সুতরাং সংকটকে বদলের শক্তিতে পরিণত করতে হলে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সংগঠিত করতে হবে, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির নেতা কমঃ জর্জি দিমিত্রভের শিক্ষা আমাদের অনুসরণ করতে হবে এবং লড়াইগুলি শেষপর্যন্ত সমাজ বদলের লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে। বিপ্লবী বামপন্থীদের কাছে এটাই নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা। নভেম্বর বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

