ওয়েব ডেস্ক : কলকাতা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার শ্যামনগর রেলস্টেশনের কাছে এক নাট্যকর্মীকে মারধর করা হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর কালো কুর্তা ও পাজামা দেখে তাঁকে মুসলিম ভেবে একদল লোক মারধর করেছে। আক্রান্ত নাট্যকর্মী শুভঙ্কর দাশশর্মা কলকাতায় একটি নাটকের প্রদর্শনী শেষে লেনিন নগরে তাঁর বাড়িতে ফেরার পথে গত ২৮ জুলাই মধ্যরাতের দিকে আক্রান্ত হন। এই হামলায় গভীর মানসিক আঘাত পান তিনি। বেশ কয়েকদিন বাড়ির ভেতরে নিজেকে আটকে রাখেন। এরপর সাহস সঞ্চয় করে মুখ খোলেন তিনি। শুভঙ্করের শেয়ার করা একটি ফেসবুক পোস্টে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মুখ দেখা যায়।
‘জনগণমন’ নামের একটি নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত শুভঙ্কর অল্ট নিউজকে বলেন, ‘সেদিন রাত ১২টার একটু আগে আমি শ্যামনগর স্টেশনে পৌঁছাই, কারণ কলকাতায় আমার একটি থিয়েটার শো ছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই আমি স্টেশন থেকে বেরিয়ে গণপরিবহণ ধরার জন্য চৌরঙ্গী ক্রসিংয়ের দিকে এগোতে শুরু করি। সেই সময় গলিটা অন্ধকার আর জনশূন্য ছিল, সব দোকানপাট বন্ধ ছিল। হঠাৎ চারজন যুবক এসে আমার মুখোমুখি হয় এবং জিজ্ঞাসা করে আমি মুসলিম কি না। এনিয়ে তর্কের জেরেই আমি আক্রান্ত হই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, প্রশ্নটির চরম ঔদ্ধত্যে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারা আমার কাছে এসে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে যে, আমি কালো কুর্তা-পাজামা পরে আছি বলেই আমি মুসলিম কি না। আমি পাল্টা বলি, এনএসজি কমান্ডোরাও তো পুরো কালো পোশাক পরে, তাতে কি তারাও মুসলিম হয়ে যায়? কিন্তু যুবকদের দলটি জেদ করতেই থাকে। তাদের শারীরিক ভাষা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।’
শুভঙ্কর বলেন, তখন তিনি কেবল নিজেকে বাঁচানোর জন্য তিনি যে মুসলিম নন, একথা না বলার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত নেন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, শুধু নিজের প্রাণ বাঁচাতে আমি যে হিন্দু, একথা বলাটা পাপ হবে, কারণ এর অর্থ হবে যে আমি তাদের হুমকির কাছে নতি স্বীকার করেছি। তাই আমি বললাম, ‘আমি যদি মুসলিম হই? এই দেশটা কি মুসলিমদের নয়? মুসলিম হওয়া কি কোনও অপরাধ?’
তার মতে, এই জবাবে দলটি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কথার লড়াই শারীরিক আক্রমণে পরিণত হয়। তারা আমাকে ঘুষি ও লাথি মারতে শুরু করে।’ ‘তারা আমার মুখে, চোখে এবং কানের নিচে ঘুষি মারে। নিজেকে বাঁচাতে আমি যখন রাস্তায় পড়ে যাই, তখন তারা আমার পাঁজরের খাঁচায় এবং পিঠেও লাথি মারে। শীঘ্রই আমি জ্ঞান হারাই।’
তিনি বলেন, তিনি বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলেন। ‘আমি অজ্ঞান হয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিলাম। যেহেতু শেষ ট্রেনটি চলে গিয়েছিল, তাই কোনও পথচারী ওই রাস্তা দিয়ে যায়নি এবং কেউ আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। ধীরে ধীরে আমার জ্ঞান ফেরে এবং আমি নিজেকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি নিয়ে আসি। যেহেতু আমি একা থাকি, তাই এই আঘাতের প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর জন্য আমি দুই দিন নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছিলাম।’
পরে শুভঙ্কর ইমেলের মাধ্যমে নোয়াপাড়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অল্ট নিউজ অভিযোগটি দেখেছে। অভিযোগে তিনি বলেছেন যে, তার হামলাকারীরা তাকে বারবার ঘুষি ও লাথি মারার সময় ‘জয় শ্রী রাম’ বলে চিৎকার করছিল। পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে শুভঙ্কর প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ব্যারাকপুরের ড. বিএন বোস মহকুমা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়েছিলেন। তাঁর আঘাতের তীব্রতার কারণে, ডাক্তাররা তাঁকে বিশেষ চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীকালে তিনি আরও চিকিৎসার জন্য ৩ জুলাই এবং ৪ জুলাই হাসপাতালে পুনরায় যান।
শুভঙ্কর বলেন, ‘আমি নাক-কান-গলা এবং অর্থোপেডিকস বিভাগে গিয়েছিলাম। ডাক্তাররা বলেছেন যে হামলার সময় আমার কানের পর্দা ফেটে যাওয়ায় সেখানে পুঁজ ও তরল জমেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আমার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আমার শ্রবণশক্তি ভালো থাকা দরকার। তা না হলে, এটি আমার কর্মজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। আমার পাঁজরের খাঁচাতেও আঘাত আছে।’ নোয়াপাড়া থানার পুলিশ আধিকারিক সোমনাথ দুবে ৬ আগস্ট অল্ট নিউজকে জানান যে একটি তদন্ত চলছে।
‘মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, কিন্তু আমি কেন চুপ থাকব?’ প্রশ্ন তোলেন শুভঙ্কর। তিনি ফেসবুকে তাঁর ঘটনাটি শেয়ার করার পর নাট্যকর্মী জয়রাজ ভট্টাচার্য এই ঘটনাটিকে আরও ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জয়রাজ অল্ট নিউজকে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদলের সমর্থকেরাই শুভঙ্করকে আক্রমণ করেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়ানো এবং এই পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আমি ওকে নিয়ে গর্বিত। নাট্যকলা ঠিক এই সারমর্মকেই মূর্ত করার চেষ্টা করে। সমগ্র নাট্যজগৎ তার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমরা আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা ঠিক করছি এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি এই গুণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পরিকল্পনা করছি।’
নিজের এলাকাতেই নিরাপত্তাহীন বোধ করছেন জানিয়ে শুভঙ্কর আরও বলেন, ‘কোনও পাড়াই নিরাপদ নয়। রাজ্যজুড়ে ভিড়-সংস্কৃতি (মব কালচার) ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্তদের দিকে ডিম ছোড়া হচ্ছে, পুলিশ প্রকাশ্যে অভিযুক্তদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করছে, কোমরে দড়ি বেঁধে অর্ধনগ্ন অবস্থায় ঘোরানো হচ্ছে। এটা কখনওই বাংলার সংস্কৃতি ছিল না। যদি এত মানুষ কষ্ট পায়, তাহলে আমি কীভাবে ব্যতিক্রম হওয়ার আশা করতে পারি?’ তিনি বলেন, প্রথমে ঘটনাটি জনসমক্ষে আনতে চাননি তিনি। কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে আমি হয়তো স্থানীয়ভাবেই এই পরিস্থিতির সমাধান করতে পারব, তাই আমি বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে চাইনি। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম এবং আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু যখন আমার বোন ঘটনাটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখল এবং আমি বিজেপি সমর্থকদের মন্তব্যগুলো দেখলাম, তখন আমি ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে লেখার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তাঁর কথায়, ‘আমি কেন চুপ থাকব?’
সৌজন্যে : অনিন্দ্য হাজরার প্রতিবেদন, অল্ট নিউজ (altnews.in)


