ওয়েব ডেস্ক : রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টান সম্প্রদায়, গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর একাধিক হামলার ঘটনায় ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (বিসিপি)। গত ৮ জুলাই এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এইসব হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি বিসিপি জানিয়েছে যে, আগামী ১৪ জুলাই কলকাতার চৌরঙ্গি স্কোয়ারের স্টেটসম্যান হাউসের সামনে এক শান্তিপূর্ণ প্রতীকী বিক্ষোভ সভা সংগঠিত করবে তারা। সেই সঙ্গে জানিয়েছে যে,
এইসব লক্ষ্যভিত্তিক হামলার পূর্ণ বিবরণ দিয়ে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা অবিলম্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে খুব শীঘ্রই মাননীয় রাজ্যপাল এবং পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি উচ্চপর্যায়ের স্মারকলিপি পেশ করবে। বিসিপি জানিয়েছে, গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়, গির্জা এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর একের পর এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক, সুপরিকল্পিত এবং বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই উগ্রপন্থী আক্রমণগুলির ধরন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একই কৌশল অনুসরণে সংগঠিত। প্রথমে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হচ্ছে, এরপর ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ’-এর অভিযোগ তুলে পরিকল্পিতভাবে পাল্টা মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারমূলক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হল আক্রান্ত খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে আইনগতভাবে বিপর্যস্ত করা এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করা।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া তিনটি বিশেষ উদ্বেগজনক ঘটনার বিবরণও দিয়েছে বিসিপি।
ঘটনা এক, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পালবাড়ি এলাকায় ৪ জুলাই এক নবদম্পতিকে ঘিরে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ধন্যবাদজ্ঞাপন প্রার্থনাসভা এবং নৈশভোজ চলাকালীন একদল উগ্রপন্থী আচমকা হামলা চালায়। সেখানে উপস্থিত খ্রিস্টান ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের মহিলাদের শারীরিকভাবে নিগৃহীত করা হয়। তাঁদের সিঁদুর এবং শাখা-পলার মতো বৈবাহিক প্রতীক জোরপূর্বক মুছে ফেলা ও নষ্ট করা হয়। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের আটকাতে কোনও কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। বরং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (আইসি) সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগে গির্জার যাজক রেভারেন্ড অনুপ ঘোষকে বেআইনিভাবে আটক করেন। ঘটনা দুই, পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার ফরিদপুর কলোনির ‘গ্রেস চার্চ’-এ গত ৫ জুলাই রবিবার সকালের পবিত্র উপাসনা চলাকালীন লাঠিসোটা নিয়ে একদল দুষ্কৃতী জোর করে গির্জায় প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
হামলাকারীরা মূল উপাসনালয়ের ব্যাপক ক্ষতি করে, আবাসিক অংশে ভাঙচুর চালায় এবং নগদ ২৫ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন, ট্রফি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র লুট করে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, এই হামলার আগে গির্জা কর্তৃপক্ষের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই হামলার আশঙ্কায় ৪ জুলাই কাটোয়া থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে আশঙ্কামূলক অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ এর প্রতিরোধে কোনও পদক্ষেপ করেনি।

ঘটনা তিন, গত ৫ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুর, সুভাষগ্রামের বুড়িবটতলা এলাকায় নবনির্মিত একটি গির্জায় ধর্মীয় স্লোগান দিতে দিতে একদল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি হামলা চালায়। গির্জার ছাদে স্থাপিত পবিত্র ক্রুশ সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয় এবং গির্জার দরজাও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ জানাতে সোনারপুর থানায় গেলে কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিক তাঁদের জেনারেল ডায়েরি (জিডি) নম্বর বা অভিযোগ গ্রহণের কোনও লিখিত স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। পরবর্তীকালে বিসিপির (BCP) আইন সহায়তা সেলের হস্তক্ষেপে এফআইআর নথিভুক্ত হলেও, ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ২৯৮ ও ২৯৯ ধারার মতো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং উপাসনালয় ধ্বংস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও খড়গপুরের বড়বটিতে অবস্থিত ‘বেথেল চার্চ’-এ অনুরূপ হামলা এবং পরবর্তীকালে ওই গির্জার যাজককে গ্রেফতার করার ঘটনায় সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সমাজের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ আরও তীব্র হয়েছে।

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (BCP) বেশকিছু কর্মসূচি নিয়েছে। আজ শনিবার
বিসিপির নেতৃত্বে বিভিন্ন গির্জার প্রধান, ধর্মযাজক এবং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সোনারপুরের আক্রান্ত গির্জা পরিদর্শনে যাবেন। তাঁরা ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি সংহতি প্রকাশ করবেন।
পাশাপাশি, ধারাবাহিক এই আক্রমণের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ জানাতে তারা আগামী মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কলকাতার চৌরঙ্গি স্কোয়ারের স্টেটসম্যান হাউসের সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতীকী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত করবেন। এছাড়াও এই লক্ষ্যভিত্তিক হামলাগুলির পূর্ণ বিবরণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা অবিলম্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে খুব শীঘ্রই মাননীয় রাজ্যপাল এবং পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি উচ্চপর্যায়ের স্মারকলিপি পেশ করবেন তারা।

বিসিপির দাবি, প্রতিটি ঘটনার অবিলম্বে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত করতে হবে এবং গির্জায় ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সোনারপুর মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রাসঙ্গিক ধারা, বিশেষ করে ২৯৮ ও ২৯৯ ধারা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং যাজক অনুপ ঘোষ-সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মিথ্যা মামলা নিঃশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে। তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান পরিবার এবং তাদের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশকে অবিলম্বে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (BCP) সমস্ত গির্জার নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং সকল সচেতন নাগরিকের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে যে, এই সংকটময় সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুন।

(বিসিপির ইংরেজি প্রেস বিজ্ঞপ্তির অনুবাদ করেছেন মলয় তেওয়ারি। এই বিজ্ঞপ্তি তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত)

73 Views