ওয়েব ডেস্ক : জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল ‘ফোর পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক’-এর হয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি অনুষ্ঠানের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শাহীন খান ও তাঁর সহকর্মী নাফিসা খান। বৃহস্পতিবার সাকেত পুলিশ স্টেশন থেকে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পেশ করে শাহীন খান জানান যে, পুলিশ তাঁকে এবং তাঁর সহকর্মী নাফিসা খানকে মারধর করেছে। খানের ওই ভিডিও প্রতিবেদনে দুজনেরই আঘাতের চিহ্ন এবং নাফিসার শোচনীয় অবস্থা দেখানো হয়েছে। তিনি নিজের বাহুতে কালশিটে দাগ ক্যামেরাবন্দী করেন এবং নাফিসাকে প্রায় অচেতন অবস্থায় দেখান। তার হাঁটুর ওপরের উরুতে লাঠির আঘাতে সৃষ্ট লাল দাগ দেখা যায়। আরও দেখা যায় যে, নাফিসাকে একটি সোফায় বসিয়ে ধরে রাখা হয়েছে এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা তৃতীয় এক নারী তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। যদিও খানের ওই ভিডিওতে ক্যামেরাম্যানকে দেখা যায়নি।

ফোর পিএম-এর এক্স-এ শেয়ার করে তাঁর প্রতিবেদনে খান বলেছেন, তাঁদের সবাইকে পুলিশ স্টেশনে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ তারা ‘মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন’। তিনি অভিযোগ করেন যে, যখন তিনি নিজের নাম প্রকাশ করেন, পুলিশ সেটাকে তাঁর ধর্মের প্রকাশ হিসেবে ধরে নেয় এবং তাঁর ওপর আরও কঠোরভাবে হামলা চালায়। সাকেত থানা থেকে যখন খান তাঁর রিপোর্ট রেকর্ড করছিলেন, তখন তাঁর ক্যামেরার ফ্রেমে একজন পুলিশ এবং আরও দুজনকে দেখা যায়। তিনি তখন রাগে লাল হয়ে প্রায় কেঁদে ফেলছিলেন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘আমাদের মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে নির্যাতন করার পর, তারা আমার নাম জিজ্ঞাসা করে, এবং আমি বলি আমি একজন খান, আমার নামে ‘খান’ আছে, আর সেই কারণেই দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তারা আমাদের ওপর হামলা করেছে, লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে, চড় মেরেছে’। এই পর্যায়ে হেল্প ডেস্কে বসে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা এমন কিছু বলেন যা প্রায় শোনা যায় না, যার উত্তরে খান ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হবে – অবশ্যই হবে তদন্ত।’ ‘মুসলমান’-এর নামে আজ আমাদের ওপর যে ধরনের ঘৃণা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, দিল্লি পুলিশ, এর জন্য আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে’। এরপর তিনি এবং ক্যামেরাম্যান সহ পাশের একটি ঘরে প্রবেশ করেন, যেখানে নাফিসা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল এবং প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিল। ওয়েটিং রুমে আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনার ছবিতে দেখা যায় যে, নাফিসাকে হাঁটতে অক্ষম মনে হওয়ায় তার পরিচিত লোকজন তাকে পুলিশ স্টেশন থেকে কাঁধে করে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। খানের যে ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে যায়, সেখানে তাঁকে পুলিশ স্টেশনের মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

থানা থেকে ভিডিও রিপোর্টটি শেয়ার করার সময় ফোর পিএম নিউজ নেটওয়ার্কের এডিটর-ইন-চিফ সঞ্জয় শর্মা বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলিতে, ফোর পিএম ধারাবাহিকভাবে দিল্লি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সম্পর্কিত বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছিল এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল। এমন প্রেক্ষাপটে, আজকের এই পদক্ষেপটি সেই প্রতিবেদন এবং প্রশ্নগুলির সঙ্গে কোনও ভাবে সংযুক্ত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।’ মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা কবে থেকে অপরাধ হয়ে গেল? ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন কবে থেকে এত বিপজ্জনক হয়ে উঠল? আর একজন সাংবাদিকের নামে ‘খান’ থাকা কি তাকে মারধরের কারণ হতে পারে? এসব প্রশ্ন করেন তিনি এক্স-এ।
সাংবাদিকদের বক্তব্য এবং শর্মার কথা উল্লেখ করে ডিজিপাব একটি বিবৃতিতে দিল্লি পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শর্মা বলেছেন, তাঁর চ্যানেলকে সরকার বারবার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ডিজিপাবের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের প্রশ্ন করা সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার একটি মৌলিক অংশ। সাংবাদিকদের অবশ্যই ভয়, ভীতি প্রদর্শন বা বৈষম্য ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হতে হবে।’ বিবৃতিতে একটি স্বাধীন তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া (পিসিআই), ইন্ডিয়ান উইমেন’স প্রেস কর্পস (আইডব্লিউপিসি), দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস (ডিইউজে), প্রেস অ্যাসোসিয়েশন এবং কেরালা ইউনিয়ন অফ ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস এদিন বিকেলে এই হামলার নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, সাংবাদিকদের ভাষ্যমতে, দুই নেতাকে একটি প্রশ্ন করার জন্য পুলিশ শুধু তাদের টেনে হিঁচড়ে নিয়েই যায়নি, বরং তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় জানার পর আরও বেশি মারধর করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘থানায় প্রবেশ করার পর, স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) পুলিশ কর্মকর্তাদের দুই সাংবাদিককে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে মহিলা কর্মকর্তারাও যোগ দেন এবং শাহীন ও নাফিসাকে মারধর শুরু করেন।’ এতে বলা হয়েছে, দুই সাংবাদিককেই এফআইআর করার হুমকি দেওয়া হয় এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে মৌখিক নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বিবৃতিতে ‘দুই সাংবাদিকের ওপর হামলায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত শুরু করার জন্য দিল্লি পুলিশের কমিশনার, অনুরাগ কুমারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে’। এছাড়াও ওই বিবৃতিতে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার প্রতি আবেদন জানিয়ে বলা হয় যে, ‘যারা সহিংসভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা করেছিল’ সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করা হোক। কংগ্রেস পার্টি এবং আম আদমি পার্টির সোমনাথ ভারতী-সহ বেশ কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দল এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা করেছে।

সূত্র : দ্য ওয়ার ডট ইন (thewire.in)

97 Views