নোটন কর
‘দিমাগী নকশাল’ (Dimagi Naxal বা Intellectual Naxal) বা ‘শহুরে নকশাল’ (Urban Naxal) হলো বর্তমান ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক (Discourse)-এ বহুল ব্যবহৃত একটি পরিভাষা।
সম্প্রতি ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দটি ব্যবহার করেন। বলেন, অস্ত্রধারী নকশালদের নির্মূল করা গেলেও সমাজ থেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বা নকশাল-মনস্কদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এসেছে। তাঁর এই মন্তব্যেই যাবতীয় বিতর্কের শুরু।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি। রিজিজুর দাবি, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে তিনি এমন ব্যক্তিদের বুঝিয়েছেন, যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন এবং সংবিধান মানতে অস্বীকার করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান ও ৩৭০ অনুচ্ছেদকে সমর্থন করেন অথবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার দাবিতে গলা মেলান।
সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নকশালপন্থীদের প্রকাশ্যে হত্যার কথা বলেছিল। আর পরবর্তীকালে দেশের প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এবং সিপিএমের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক নকশাল তথা মাওবাদীদের দেশের পক্ষে সবচাইতে বড়ো হুমকি বলে অভিহিত করেছিলেন। পঃবাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কথার পুনঃধ্বনিত করেছেন।
১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি কৃষক বিদ্রোহ ভারতীয় রাজনীতিতে ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলন কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কৃষক সংগ্রাম ছিল না; ছাত্র, যুবক, শিক্ষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশের চিন্তাজগতেও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, শ্রেণিশোষণ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে র্যাডিক্যাল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। সেইসময় যুগ যুগান্তরের শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে তথা শোষণ মুক্ত সমাজ গড়ার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ যার নেতৃত্ব দিয়েছিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা। সেই থেকে এই কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নাম দেওয়া হয়েছে নকশালবাদী। যারা যেখানেই বৈষম্য যেখানেই অত্যাচার তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে মানুষকে দিশা দেখায়, বিপ্লবের কথা বলে।
নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের সমর্থকরা সাধারণত সমাজের শ্রেণিবিভাজন ও শোষণের সমালোচক। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, জমিদারি বা সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক চরিত্র সম্পর্কে তাঁদের সমালোচনামূলক অবস্থান থাকে।
দ্বিতীয়ত, তাঁরা প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে এই পরিবর্তন কী পদ্ধতিতে ঘটবে, সে প্রশ্নে তাঁদের সঙ্গে সক্রিয় নকশালপন্থী সংগঠনগুলির মতের সম্পূর্ণ মিল নাও থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, তাঁদের ভূমিকা অনেক সময় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়। সাহিত্য, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র, প্রবন্ধ, বিতর্ক বা ছাত্রজীবনের আলোচনায় তাঁরা শোষণ-বিরোধী ও বিদ্রোহী চিন্তার প্রসার ঘটাতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লার ভাষণে দিমাগী নকশাল নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার কারণ কি!
গত জুলাই মাসে এক মাসের উপর দিল্লির যন্তর মন্তরে CJP-র হাজার হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান আন্দোলন করেছিলেন। তাদের দাবি ছিল নিট (NEET) সহ একাধিক সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্ন ফাঁসের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের বর্বরোচিত আক্রমণ সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যান। অবশেষে আন্দোলনের চাপে কেন্দ্র সরকার নতি স্বীকার করে এবং শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তার কয়েক বছর আগে দিল্লীতে কৃষক আন্দোলনের চাপে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্র সরকার কর্পোরেট স্বার্থবাহী তিন কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। শ্রমিকশ্রেণি শ্রমিক বিরোধী ‘শ্রমকোড’ বাতিলের দাবিতে দেশব্যাপী লড়াই করছেন। দেশে কর্মসংস্থানের দাবিতে, ন্যূনতম মজুরির দাবিতে, বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে, কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে, হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, জল জমি জঙ্গল বিক্রি করার বিরুদ্ধে আদিবাসীদের জোরদার লড়াই চলছে। দেশজুড়ে আমজনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রের সরকার বিজেপি দিশাহারা হয়ে পড়েছে। আম জনতার ক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনে তাই শাসক দল দিমাগী নকশালদের ভূত দেখছে।
আজ থেকে প্রায় একশ আশি বছর আগে কমিউনিজমের ভূত সমগ্র ইউরোপের বুর্জোয়াশ্রেণিকে তাড়া করা শুরু করেছিল, সেই তাড়া আজও শাসকশ্রেণীকে করে চলেছে। যতদিন দেশে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা থাকবে, ততদিন দিমাগী নকশালদের প্রশ্ন শাসকশ্রেণীর প্রতি থাকবে।
সেজন্য ফ্যাসিস্ট মোদি সরকার নকশালপন্থীদের তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। কারণ নকশালবাড়ি পথ অনুসরণকারী কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এই বড় পুঁজিপতি, বড় জমিদার ও বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসন শোষণকে উচ্ছেদ করে সাধারণ মানুষের শাসন আনতে চায়। তারা সাধারণ মানুষের সুখ শান্তি নিয়ে এসে দেশ ও মানুষকে সত্যিকারের স্বাধীন করতে চায়, যেখানে মানুষ মানুষের উপর শোষণ ও নির্যাতন করবে না। কাজেই শাসকরা গরীবের বন্ধু নকশালপন্থীদের অর্থাৎ কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ধ্বংস করতে চায় ধনীদের রক্ষা করতে। কিন্তু তাদের সে আশা কোনদিনই পূরণ হবে না।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।


