নোটন কর

১৯৬৭ সালের ২৫শে মে, তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের পাঠানো আধা সামরিক বাহিনীর নির্বিচার গুলি চালনায় ১১ জন নিহত হন। যার মধ্যে ছিলেন ৮ জন নারী, ১ জন পুরুষ ও ২ জন শিশু। তারা নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক মিছিলের জন্য ব্যাঙ্গাইজোতে জমায়েত হয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান ছিল বড় জমিদার, চা বাগান মালিক ও অন্যান্যদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক, চা শ্রমিক সহ সাধারণ মানুষের এক বিদ্রোহ। ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসী শাসনের অবসানের পর কৃষকেরা ভূমি সংস্কার করতে শুরু করেন অর্থাৎ জমিদারদের কব্জায় থাকা খাস, বেনামি সহ সমস্ত জমি নিয়ে ভূমিহীন গরীব কৃষকদের মধ্যে বিলি করে দেন, কৃষকদের উপর সমস্ত ঋণ বাতিল করে দেন, জমিদারদের থেকে সমস্ত বন্ধকি জিনিসপত্র উদ্ধার করে কৃষকদের ফেরত দেন, জমিদারদের গোলায় থাকা বাড়তি মজুত ফসল বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দেন। এককথায় জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকরা নকশালবাড়িতে বিদ্রোহে ফেটে পড়েন। কিন্তু সিপিএম, সিপিআই, এসইউসিআই সহ বিভিন্ন সংসদীয় বাম দলগুলি ঐ সময়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শরিক থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের উপর পুলিশের গুলি চালনায় কোনও প্রতিবাদ করেনি। তারা শোষিত কৃষকদের পাশে না দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য বল প্রয়োগের আশ্রয় নেয়। যুক্তফ্রন্ট সরকারের কোনও শরিক দল সরকার ছেড়ে বেড়িয়ে আসেনি। এটা আবারও প্রমাণিত হয় যে মুখে ‘বাম’ বুলি আওড়ালেও সবাই প্রকৃত বামপন্থী হতে পারে না। আন্দোলন হল মাপকাঠি যাতে সবার প্রকৃত চেহারা ফুটে ওঠে।

আজ নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের পর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। আন্দোলনের ফলে গ্রামাঞ্চলে জমিদারতন্ত্র এখন অনেক দুর্বল। রাজ্যে বড় জোতের মালিক প্রায় নেই। বড় জমিদারদের জায়গা গ্রহণ করেছে ছোট জমিদার, গ্রামীণ সুবিধাভোগী শ্রেণী, সরকারি আমলা, পঞ্চায়েত বাবু, ফাটকাবাজ ইত্যাদিদের এক জোট, যাদের অত্যাচারে গ্রামীণ মানুষ অতিষ্ঠ। রাজ্যে জমির বন্টন আজও অসম, এখনো অসেচ এলাকায় সাড়ে সতেরো একর ও সেচ এলাকায় সাড়ে বারো একর জমি হল সিলিং-এর উর্ধ্বসীমা। বর্গাদারদের প্রায়ই জমির খতিয়ানে নথিভুক্ত করা হয় না, ফলে বর্গা উচ্ছেদের বিপদ অনেক বেড়ে গেছে। ক্ষেতমজুররা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি পান না, তাদের জন্য কোনও সর্বাঙ্গীণ আইন নেই। শিল্পায়ন, উন্নয়নের নামে জমি থেকে কৃষকদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। বর্তমান রাজ্যের বিজেপি সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে জমির ঊর্ধ্বসীমা তুলে নেওয়ার কথা বলেছে। গ্রামে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভূমিহীন। সার, বীজ কীটনাশক, পেট্রোল, ডিজেল-সহ কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির ফলে চাষের খরচ অনেক বাড়ছে অথচ কৃষক লাভজনক দাম পায় না। গ্রামাঞ্চলে ঋণ ও অভাবী আত্মহত্যা বাড়ছে। বিজেপি সর‍কার বড় পুঁজিপতি ও সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে কাজ করে। তারা কৃষক বিরোধী কৃষি আইন লাগু করতে চায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, কলকারখানা বন্ধ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, যানবাহনের বেহাল দশা, সরকারি ক্ষেত্রে চুরি দুর্নীতি সব মিলিয়ে সমাজ জীবন আজ বিপর্যস্ত। অন্যদিকে ফুলে ফেঁপে উঠছে দেশী বিদেশী কর্পোরেটরা।

সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জায়গায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। প্রথম থেকেই তারা বিরোধীদের উপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেছে। শুধু যে বিরোধীদের পার্টি অফিস দখল করেছে তাই নয়, তাদের লোকজনদের মারধোর, ঘরবাড়ি ভাঙ্গচুর,, এমনকি কোথাও কোথাও তারা লেনিন মূর্তির উপর হামলা ও ভাঙ্গচুর করেছে। এখানেই না থেমে তারা বুলডোজার রাজ শুরু করেছে। পুনর্বাসন না দিয়ে ব্যাপকহারে হকার উচ্ছেদ করছে। তাদের রুজি রোজগার কেড়ে নিচ্ছে। বেআইনী নির্মাণ ভাঙ্গার অজুহাতে তারা বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ লোকজন বিশেষত গরীবদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ইত্যাদি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের এই আক্রমণের মূল নিশানা বিশেষত সংখ্যালঘু মুসলিমরা। বিজেপি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে একের পর এক ফরমান জারি করে তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করতে চাইছে। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার ভোটার লিস্টে যাদের নাম নেই তাদের সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার কথা বলেছে।
এটা স্পষ্ট যে কর্পোরেট, বড় পুঁজিপতি বা সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে এই সরকারের কোনও কর্মসূচি নেই, বরং তাদের স্বার্থে সরকার কাজ করবে এটা পরিষ্কার। অদূর ভবিষ্যতে তারা এই আক্রমণ আরও বিশাল আকারে সাধারণ মানুষের উপর নামিয়ে আনবে। কর্পোরেট, বড় পুঁজিপতি তথা সম্পত্তিবানদের স্বার্থ রক্ষায় এই সরকার কাজ করবে। বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দাবিতে সংগ্রামরত ঠিকা শ্রমিকদের যেভাবে তারা আক্রমণ করেছে, উড়িষ্যার সিজিমালিতে যেভাবে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আদিবাসীদের উপর তারা আক্রমণ চালিয়েছে বা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর যেভাবে তারা হামলা করেছে তাতে এটা পরিষ্কার যে আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপি সরকারের কাছ থেকে কি ধরনের ব্যবহার পেতে চলেছেন!

তাই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রদের সংগ্রামের জন্য তৈরি হতে হবে। এক শোষণহীন সমাজ গড়ার জন্য ভাবতে হবে। ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলন তার এক পথ দেখিয়েছিল।

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

ছবি : পার্থ মিত্র

113 Views