নোটন কর
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে অপমান করলেন। গত ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫ জন্মদিবস উপলক্ষ্যে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মহম্মদ আলি পার্কে যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বক্তৃতা করছেন, তখন ফরোয়ার্ড ব্লকের গুণ্ডারা শ্যামাপ্রসাদের মাথায় পাথর মেরে তাঁকে রক্তাক্ত করে দিয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির যে জনপ্রিয়তা ছিলো, তিনি মঞ্চ থেকে একটু উত্তেজক বিবৃতি দিলে সেদিন ফরোয়ার্ড ব্লকের কেউ জীবিত থাকত না। সাথে শমীক ভট্টাচার্য আরও বলেন, কলকাতা কর্পোরেশনের ভেতর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিগৃহীত যিনি /কে করেছিলেন তাঁর নাম বললে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হবে।’ শমীক ভট্টাচার্য ও তাঁর দল বিজেপি ভালভাবেই জানে, সেদিন ফরোয়ার্ড ব্লকের অধিপতি ছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। শমীক ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন এই বলে, ‘শ্যামাপ্রসাদ এই ঘটনাগুলি নিয়ে কোনও কিছু ডায়রিতে লিখে যাননি’! অথচ তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি ‘লিভস্ ফ্রম এ ডায়েরি’-তে লিখেছিলেন, ‘যেখানেই তারা সভা করতেন, নেতাজীর আদেশে ফরোয়ার্ড ব্লক তা ভণ্ডুল করে দিত’। ঠিক এই কারণগুলির জন্যই নেতাজীকে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরিতে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘হিন্দুবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ্য, ঘটনাগুলির সময়কাল ছিল গত শতাব্দীর তিরিশের শেষ দশক থেকে এবং চল্লিশের গোড়ার দিকে। সেইসময় নেতাজী বলেছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও হিন্দু মহাসভা হচ্ছে দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল। এই প্রসঙ্গে নেতাজির বক্তব্য ছিল, ‘সন্ন্যাসী সন্ন্যাসিনীদের ত্রিশূল হাতে হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষায় পাঠিয়েছে। ত্রিশূল আর গেরুয়া বসন দেখলেই হিন্দু মাত্রই শির নত করে। ধর্মের সুযোগ নিয়ে ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। হিন্দু মাত্রেই এর নিন্দা করা কর্তব্য। এই বিশ্বাসঘাতকদের আপনারা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সরিয়ে দিন। এদের কথা কেউ শুনবেন না। আমরা চাই দেশের স্বাধীনতাপ্রেমী নরনারী একপ্রাণ হয়ে দেশের সেবা করুন।… হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলিয়া হিন্দুরাজের ধ্বনি শোনা যায়। এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা। হিন্দু ও মুসলমানের স্বার্থ পৃথক ইহার চেয়ে মিথ্যা বাক্য আর কিছু হতে পারে না। বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মড়ক ইত্যাদি বিপর্যয় তো কাউকে রেহাই দেয় না।’ (১২ই মে, ১৯৪০, পঃবঙ্গের ঝাড়গ্রামের জনসভায়)।
মণিকুন্তলা সেন, তাঁর আত্মজীবনী (‘সেদিনের কথা,’ কলকাতা, নবপত্র প্রকাশন, ১৩৫৯, পৃ. ২৩৭-৪০’)-তে শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে বলেছেন, “…আমরা সেইসময় প্রচারমূলক কর্মসূচীর সমাপ্তির উদ্দেশ্যে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে একটা জনসভা ডেকেছিলাম। প্রধান বক্তা শ্রীযুক্তা সরোজিনী নাইডু আর সভানেত্রী ছিলেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী। মিটিং-এর ঘণ্টাখানেক আগে আমরা হলের দুয়ারে গিয়ে তাজ্জব। হল তখন পরিপূর্ণ। রাস্তা বা গেট দিয়ে প্রধান বক্তা ও সভানেত্রীকে নিয়ে আমরা ঢুকতেই পারছি না ভিড়ের ঠেলায়। ভাবলাম, হয়তো আমাদের মিটিং শুনতেই এত লোকের আগমন। কিন্তু এত অবাঙ্গালী কেন? তাদের মধ্যে তো আমরা প্রচারে যাইনি। তাদের চেহারা আর হাবভাব দেখেও কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। অতিকষ্টে ভেতরে ঢুকে দেখি মঞ্চে উপবিষ্ট রয়েছেন স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ ও রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিছু মাড়োয়ারী ভদ্রলোকও ছিলেন এবং অনুরূপা দেবীও উপস্থিত। কোনও মতে দুখানা চেয়ার যোগাড় করে মিসেস নাইডু ও প্রভাবতী দেবীকে বসালাম। চারিদিকে তাকিয়ে দেখি সভায় বাঙালী কেউ নেই, উপরের গ্যালারী জুড়ে বসে আছে একগলা ঘোমটা দেওয়া সব মাড়োয়ারী মেয়েরা। আমার বুক ঢিপ্ ঢিপ্ করতে লাগল। কি করব এখন? শ্যামাপ্রসাদকে বললাম, এটা তো আমাদের ডাকা সভা, মিসেস নাইডু এসেছেন বক্তৃতা করতে। উনি বললেন, ‘বেশ তো, করুন না মিটিং।’ মিসেস নাইডুকে যেন তিনি চেনেন না এমন ভাব দেখালেন। কোনও মতে মিসেস নাইডুকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। মিসেস নাইডুর কম্বুকণ্ঠ ডুবে গেল সভাস্থ লোকের হল্লায়। খানিকক্ষণ বলার বৃথা চেষ্টা করে তিনি বসে পড়লেন। এই মিটিং আমরা করতে পারব না বুঝে বিশেষ অতিথিদের নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম। …শ্যামাপ্রসাদের স্বরূপ আমরা দেখেছিলাম পূর্ব-বর্ণিত সভায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, গাড়ি গাড়ি মেয়ে আনা হয়েছিল পাথুরেঘাটা থেকে এবং তাদের বলা হয়েছিল সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান করে দেবার আইন বন্ধ করার জন্য তোমাদের যেতে হবে। বেচারীরা মুসলমান হবার ভয়ে এসে হল্লা করে গেল। দু’টো করে টাকাও নাকি প্রত্যেকে পেয়েছিল।” এই হচ্ছে শ্যামাপ্রসাদের চরিত্র ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। পঃবাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর জনরোষের নামে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের উপর যেভাবে ডিম ছুঁড়ে ‘মববাজী’ করছে তার সাথে পূর্বেকার ঘটনাগুলির মিল খুঁজে পাচ্ছেন কি? হিন্দুত্ববাদীরা সাধারণ অর্থে হিন্দুধর্মের পক্ষে নন, এরা ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুবাদী ও কর্পোরেট রাজনৈতিক হিন্দুত্বের পক্ষে।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি বা হিন্দুত্ববাদীরা কেন ইতিহাস বিকৃত করে শ্যামাপ্রসাদকে বর্তমান সময়ে মহিমান্বিত করতে চাইছে? তার কারণ সচেতন ইতিহাস পাঠকেরা অনেকই জানেন। তবু এপ্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলা যাক। হিন্দু মহাসভার দুই নেতা ছিলেন দামোদর বিনায়ক সাভারকর ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। দুই হিন্দুত্ববাদী নেতাই হিটলারের দর্শন ও কাজকর্মের প্রশস্তি করে গেছেন এবং ত্রিশের দশকের জার্মানিতে ইহুদিদের প্রতি অবর্ণনীয় নিষ্পেষণ, ঘৃণা ও হিংসাকে সমর্থনযোগ্য মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাভারকরের নেতৃত্বে মহাসভার হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদলকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বিরোধিতায় শামিল হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৪২ সালের ২৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ ব্রিটিশ গভর্নর জন হারবার্টকে চিঠি লিখে জানান, ‘কেমন করে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মোকাবিলা করতে হবে? এই (বাংলা) প্রদেশের ব্রিটিশ শাসকদের কাজ হল, কংগ্রেসের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই আন্দোলনকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেওয়া। ভারতীয়দের ব্রিটিশ সরকারকে বিশ্বাস করতেই হবে।’ (সূত্র: এ জি নুরানি, আরএসএস অ্যান্ড দ্য বিজেপি: আ ডিভিশন অব লেবার।)
আরএসএস-এর আরেক নেতা গোলওয়ালকরের নির্দেশে শ্যামাপ্রসাদ ১৯৫১ সালে মহাসভা ছেড়ে ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন, মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পরবর্তী সময়ে তীব্র জনরোষকে সংসদে সামাল দেওয়ার জন্যে। মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী আরএসএস-এর সদস্য ও হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত ছিল। এই জনসঙ্ঘ পরবর্তীকালে বিজেপি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সভাপতিত্বকালেই কংগ্রেস দল কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার দ্বৈত সদস্যপদ নিষিদ্ধ করেছিল। অর্থাৎ, এক সংগঠনের সদস্য থাকলে অন্যটির সদস্য থাকা চলবে না। মুসলিম লীগের পক্ষেও সেই একই আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের ৪ মে ফরওয়ার্ড ব্লকের কাগজে ‘কংগ্রেস এবং সাম্প্রদায়িক সংগঠন’ শিরোনামে সুভাষ চন্দ্র সম্পাদকীয় লেখেন, ‘হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কোনও সদস্য কংগ্রেসের কোনও নির্বাচনী কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।’
মনে রাখতে হবে, সেই একই সময়ে বাংলায় হাজার হাজার যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী ব্রিটিশবিরোধী লড়াই করে প্রাণ দিচ্ছিল, অত্যাচারিত হচ্ছেন, সর্বস্ব ত্যাগ করছেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র তৈরি হচ্ছেন তাঁর মহাসংগ্রামের জন্য। দেশের বাইরে থেকে চলছে তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের পরিকল্পনা, জার্মানি ও জাপানের সহায়তা নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার প্রয়াস। আজকের শ্যামাপ্রসাদ ও সাভারকরের সমর্থকদের হাতে সেই ইতিহাস বিকৃত করার দরকার আছে। যেহেতু এদের দল বা নেতৃত্ব স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনও ভূমিকা রাখেনি। ব্রিটিশদের প্রতি চাটুকারিতা করেছে। সেইসময় যে সমস্ত জাতীয়বাদী নেতৃত্ব ও দল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরোধিতা করেছিলেন আজ তাঁদের বিরূদ্ধে কুৎসা করছে বিজেপি ও সংঘ পরিবার। সেইজন্যই রাজ্য বিজেপি সভাপতি ও হিন্দুত্ববাদীদের নেতাজী-সহ অন্যান্য মনীষীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা। সুভাষচন্দ্র বসুর কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে৷ কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। দেশবাসী এবং বাঙালির কাছে তিনি ‘নেতাজি’ এবং দেশপ্রেমের প্রতীক। শমীক ভট্টাচার্য ফরোয়ার্ড ব্লক দলকে গুন্ডাদের দল এবং নেতাজি-কে ঘুরিয়ে ‘গুণ্ডাদের সর্দার’ বলেছেন৷ বাঙালি কি তা মেনে নেবে?
—————————-
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী ।

