ডাঃ চন্দ্রশেখর পাত্র
কিডনি ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হলেও বিশ্বজুড়ে এর প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। কিডনি ক্যানসার শনাক্ত করার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই নীরবে বিকাশ লাভ করে এবং তেমন কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে একটি সতর্কতামূলক লক্ষণ রয়েছে, যা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়—প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে হেমাটুরিয়া (Hematuria) বলা হয়। এতে প্রস্রাবের রং গোলাপি, লাল বা কালো রঙের মতো হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে খালি চোখে রক্ত দেখা যায় না; শুধুমাত্র ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে তা ধরা পড়ে। যদিও প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়ার পেছনে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনিতে পাথর বা প্রোস্টেটজনিত সমস্যার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, তবুও এটি কিডনি ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কিডনি ক্যানসার তখন হয়, যখন কিডনির অস্বাভাবিক কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে টিউমার তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো রেনাল সেল কার্সিনোমা (Renal Cell Carcinoma), যা অধিকাংশ কিডনি ক্যানসারের জন্য দায়ী। রোগটি যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তবে চিকিৎসার ফলাফল সাধারণত অত্যন্ত ইতিবাচক হয়। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক রোগী প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলেও এটিকে সাময়িক বা তুচ্ছ সমস্যা মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।
প্রস্রাবে রক্ত ছাড়াও কিডনি ক্যানসারের অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে কোমর বা পাশের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পেটে অস্বাভাবিক গাঁট বা ফোলাভাব, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, জ্বর বা খিদে না পাওয়া। তবে এই উপসর্গগুলো সাধারণত রোগের অগ্রসর পর্যায়ে দেখা দেয়। তাই প্রাথমিক সতর্ক সংকেতগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন কয়েকটি কারণ রয়েছে। ধূমপান অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। এছাড়া স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ এবং পরিবারে কিডনি ক্যানসারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, তামাকজাত দ্রব্য পরিহার, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা এই রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বর্তমানে কিডনি ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আজকাল অনেক কিডনি টিউমার অন্য কোনও কারণে করা ইমেজিং পরীক্ষার সময় হঠাৎ করেই ধরা পড়ে। টিউমারের আকার ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি অথবা একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় ব্যবহার করা হতে পারে।
ওয়ার্ল্ড কিডনি ক্যানসার ডে উপলক্ষে কিডনি ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে, বিশেষ করে যদি তা বারবার হয় বা এর কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকে, তবে সেটিকে কখনোই ছোটখাটো সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়, চিকিৎসা আরও কার্যকর হয় এবং রোগীর সুস্থতার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রাথমিক সতর্কবার্তায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে।
লেখক কনসালটেন্ট ইউরোলজিস্ট, নারায়ণা
হাসপাতাল, বারাসাত


