বিক্রম পাল : পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও পড়ুয়াদের জন্য যে আরেকটা জগৎ রয়েছে, তা দেখা গেল অশোকনগর বিদ্যাসাগর বাণীভবন উচ্চ বিদ্যালয়ে। জীবনের প্রথম ও পরম গুরু মা এবং বাবা, এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের নিয়ে অভিনব গুরুপূর্ণিমা উদযাপন করল এই বিদ্যালয়। বুধবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবসে গুরুপূর্ণিমার দিন সকালে বিদ্যালয়ের সুসজ্জিত সেমিনার হলে পিতা-মাতার সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করে এবং তাঁদের চরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানাল পড়ুয়ারা। যাঁদের স্নেহের পরশে বেঁচে থাকা, যাঁদের হাত ধরে পৃথিবীর আলো দেখা, সেই জন্মদাত্রী মা এবং বাবা-ই জীবনের প্রথম ও পরম গুরু, এই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টায় অশোকনগর বিদ্যাসাগর বানীভবন উচ্চ বিদ্যালয়ের এমন উদ্যোগ বোধহয় গোটা বাংলায় নজির হয়ে থাকল। কারণ, এই সময়ে দ্রুত ঘুরছে আধুনিক জীবনের চাকা, আর পাল্লা দিয়ে আলগা হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কের সুতো। সমাজ জুড়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ঠিক তখনই গুরুপূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে বাবা ও মায়ের প্রতি ভক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে পড়ুয়াদের অনুশীলন করিয়ে নজির গড়ল অশোকনগর বিদ্যাসাগর বাণীভবন উচ্চ বিদ্যালয়।

এদিন সকাল ১১টায় বিদ্যালয়ের সুসজ্জিত সেমিনার হলে সারিবদ্ধভাবে বসেন পড়ুয়াদের বাবা-মায়েরা। আর পরম ভক্তিতে তাঁদের চরণে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করে সন্তানেরা। চরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানায় খুদে পড়ুয়ারা। সন্তানকে এমন ভক্তিময় রূপে দেখে আনন্দাশ্রুতে ভেসে যান উপস্থিত বহু অভিভাবক। এই অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হয় সনাতন সংস্কৃতির বিখ্যাত শ্লোক, ‘গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ। গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।’ এই মহতী ভাবনার কারিগর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. মনোজ ঘোষ এদিন বলেন, ‘আমরা পাঠ্যপুস্তকের বিদ্যার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ গঠনে বিশ্বাসী। আধুনিক যুগে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে। তাই ছাত্রাবস্থা থেকেই মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য। কারণ পিতা-মাতাই সন্তানের আসল দেবতা, তাঁদের ঠাঁই বৃদ্ধাশ্রম নয়, হৃদয়ে।’
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এক অভিভাবিকা বলেন, ‘আজকের যুগে একটা স্কুল যে বাচ্চাদের এমন মূল্যবোধ শেখাতে পারে, তা ভাবাই যায় না। ছোট থেকেই সন্তানদের এমন সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলেই হয়ত প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে মা বাবার স্থান থাকবে।’ এদিন পড়ুয়াদের গলাতেও ছিল জীবনের আসল গুরুকে নতুন করে চেনার গভীর আবেগ। উল্লেখ্য, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই বিদ্যালয় প্রমাণ করল, শিক্ষা শুধু পুঁথিতে আটকানো থাকে না, আসল শিক্ষা লুকিয়ে থাকে সৎ চরিত্র গঠনে।

47 Views