আশিস কুমার ঘোষ, কলকাতা

পুরুষদের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলিকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে আজ বৃহস্পতিবার একটি বিশেষ পুরুষ-স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা সভা সংগঠিত করল ভারতের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্য পরিষেবা সংস্থা মণিপাল হাসপাতাল গ্রুপের অন্যতম শাখা— মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া। এই আলোচনা সভার মূল লক্ষ্য ছিল পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত নীরবতা ভাঙা, প্রোস্টেট-সংক্রান্ত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এবং রোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝানো। এই কর্মসূচি পরিচালনা করেন ড. বাস্তব ঘোষ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – ইউরোলজি ও ইউরো-অঙ্কোলজি এবং সহেলী গাঙ্গুলি, কনসালট্যান্ট – ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের ডিরেক্টর দিলীপ কুমার রায়।

ভারতে পুরুষদের স্বাস্থ্য এখনও অনেকাংশে উপেক্ষিত একটি বিষয়। তথ্য বলছে, প্রায় ৬০% পুরুষ সময়মতো চিকিৎসা নিতে দেরি করেন— কলঙ্কবোধ, সচেতনতার অভাব ও পরিবারের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই এমনটি ঘটে। পাশাপাশি, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি ছ’জন পুরুষের একজন প্রোস্টেট সমস্যায় ভোগেন, যার বেশিরভাগই ধরা পড়ে দেরিতে। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পুরুষরা অনেক সময় সমস্যার কথা জানান না— বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪০%–এর বেশি পুরুষ মানসিক চাপ বা আবেগজনিত সমস্যার কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন। এর ফলে চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, জটিলতা বাড়ে এবং পরিবারের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়।এই পরিস্থিতি বদলাতেই মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার পুরুষ-স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি পুরুষদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং মানসিক খোলামেলা কথার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে।
এদিন স্বাগত ভাষণে পুরুষদের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেন দিলীপ কুমার রায়। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা প্রায়ই পরিবারকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন। ফলস্বরূপ, অনেক সময় গুরুতর সমস্যাও অজান্তে বাড়তে থাকে। মণিপাল হাসপাতালে আমরা পুরুষ সমাজের সুস্থতা নিশ্চিত করতে এই ধরনের আলোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিই। পরিবারের জন্য যাঁরা এত কিছু করেন, তাঁদের নিজেদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদার প্রতিও দায়বদ্ধ হওয়া উচিত। আজকের এই আলোচনা সভা সেই সচেতনতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

পাশাপাশি ড. বাস্তব ঘোষ বলেন, ‘প্রোস্টেট-সংক্রান্ত সমস্যাগুলি শুরুতে সাধারণত বোঝা যায় না, কারণ এগুলি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। অনেক পুরুষই বয়সজনিত সমস্যা ভেবে লক্ষণগুলি এড়িয়ে যান। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে, তাই ৫০ বছরের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রাসী। ফলে সময়মতো শনাক্ত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাদানকারীরও উচিত রোগীদের স্ক্রিনিংয়ের বিষয়ে আরও উৎসাহিত করা। সময়মতো শনাক্ত হলে চিকিৎসার ফলাফল ভালো হয়, সুস্থ হতে কম সময় লাগে এবং জটিলতার ঝুঁকি কমে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকেই দেরিতে চিকিৎসার জন্য আসেন। আজকের মতো কথা বলার সুযোগ পুরুষদের বুঝতে সাহায্য করবে যে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া দুর্বলতা নয়— এটি তাঁদের নিজের এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব।’
এছাড়াও তিনজন অংশগ্রহণকারী— প্রণব সরকার, বিদ্যুৎ রায় এবং রাজেশ ভট্টাচার্য— যাঁরা ড. বাস্তব ঘোষের তত্ত্বাবধানে প্রোস্টেট চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। লক্ষণ দেখা থেকে সুস্থতা ফিরে পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের যাত্রাপথ সংক্ষেপে তুলে ধরে তাঁরা জানান, কীভাবে ড. ঘোষের সঠিক নির্দেশনা ও সহানুভূতিশীল আচরণ তাঁদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রোস্টেট সমস্যায় সময়মতো স্ক্রিনিং ও বিশেষজ্ঞ–নেতৃত্বাধীন চিকিৎসার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তোলে। অনুষ্ঠানের বিশেষ অংশ ছিল রোগীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা–ভিত্তিক আন্তঃআলাপ, যেখানে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা একটি বাটির মধ্য থেকে প্রশ্ন বেছে নিয়ে অন্য রোগীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। তাঁরা প্রথম কখন লক্ষণ বুঝেছিলেন, কার কাছে পরামর্শ নিয়েছিলেন, পরিবারের ভূমিকা কী ছিল, মানসিক চাপ কতটা ছিল, এবং চিকিৎসার পর তাঁদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে— এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। এই পদ্ধতি সবার মধ্যে আস্থা, মানসিক সান্ত্বনা ও পারস্পরিক সমর্থনের পরিবেশ তৈরি করে।

181 Views