নোটন কর
রাজ্যে সদ্য গঠিত বিজেপি সরকার ২০ জুন তারিখটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই মোতাবেক বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে তা পালনের জন্য সরকারি নির্দেশ জারি হয়েছে। বিজেপি-আরএসএস -এর দাবি অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের এই ঐতিহাসিক দিনে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল। তাই এই দিনে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির রূপকার হিসেবে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। কোনও সরকারি আপিসে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর অন্যথা হলে সরকার তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যাবস্থা নেবে।
উক্ত দিনটি আদৌ ঐতিহাসিক দিন ছিল, নাকি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি কালো দিন, এবার সেই ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে দেখা যাক।
১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যোগদান করেন। সে সময় বিনায়ক দামোদর সাভারকর (১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত) হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন। দামোদর বিনায়ক সাভারকার ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করার শর্তে আন্দামান জেল থেকে মুক্তি পান। যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ঠিক তার পরের বছর তাঁকে কার্যনির্বাহী সভাপতি করা হয়। মহাসভার সভাপতি হিসেবে তিনি ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন (১৯৩৪-৩৮) ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক ছাত্রকে বেত মারার ও বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তৎকালীন আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ব্রিটিশ পতাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’-কে কুর্নিশ করা বাধ্যতামূলক করেছিলেন তিনি। এমন এক অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে উপাচার্য হিসেবে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশদের পতাকাকে স্যালুট করতে রাজি না হওয়ায়, বিদ্যাসাগর কলেজের এক ছাত্রকে সবার সামনে বেত মারা হয়েছিল এবং আরও দুজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয়োজিত এক হিন্দু সমাবেশে মুসলিমদের উদ্দেশে শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন, ‘যদি পাকিস্তানে থাকতে চাও, তবে ব্যাগ-পত্তর গুছিয়ে এক্ষুনি ভারত ছাড়ো…।’ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় বিরোধিতা করেছিলেন। কংগ্রেসের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি, আইন অমান্য এবং ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, সবকটিতেই বিরোধিতা করেন শ্যামাপ্রসাদ। হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি হিসাবে ওই বছরের ২৬ জুলাই তৎকালীন বাংলার গভর্নর জন হার্বাটকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, ‘প্রশাসনের এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত যাতে ওই আন্দোলন এই রাজ্যে শক্ত ভিতের উপর না দাঁড়াতে পারে এবং ভারতীয়দের মধ্যে যাতে ব্রিটিশদের প্রতি অগাধ আস্থা তৈরি হয়’। তিনি জন হার্বার্টকে চিঠিতে আরো লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ চলার সময়ে যদি কেউ জনতার আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়, সরকার যেন তার প্রতিরোধ করে’। তিনি গভর্নরকে চিঠি লিখে ‘ব্রিটিশ সরকারের এমন বিপদের সময় পাশে থাকার’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভা-র নেতা হিসেবে দামোদর বিনায়ক সাভারকার হিন্দু ও মুসলিম এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের অবতারনা করেন। এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই কংগ্রেসের কাছে কোনঠাসা হয়ে পড়া মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান গড়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৯০৫-এর বাংলা ভাগ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও ভেদনীতির ফল, আর ১৯৪৭-এর বাংলা ভাগের পেছনে ছিল বাঙালির অন্তরমহলের বিবাদ, ভ্রান্তি ও পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণ।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এক ঘোষণাপত্রে দেশভাগের বিস্তারিত পরিকল্পনা পেশ করে। প্রস্তাবে বলা হয় পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলিম প্রধান এলাকাগুলো পাকিস্তান থেকে বাদ দেওয়া হবে। মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালের ১০ জুন এবং কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৪৭ সালের ১২ জুনের সভায় এই ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী ২০ জুন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির (বঙ্গীয় আইন পরিষদের) অধিবেশন বসে। ২০ জুন ১৯৪৭ তারিখে অবিভক্ত বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্যরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে ভোট দেন। (১) যৌথ অধিবেশন: প্রথমে সমগ্র বিধানসভার সদস্যরা একত্রে ভোট দেন (১২০-৯০ ভোটে) এবং সমগ্র বাংলাকে অখণ্ড রেখে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। (২) হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের বিভাজন: এরপর আইনসভার হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সদস্যরা আলাদাভাবে ভোট দেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের (পূর্ববঙ্গ) সদস্যরা বাংলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দেন, অন্যদিকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের (পশ্চিমবঙ্গ) সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে এবং ভারতের সাথে যুক্ত থাকার পক্ষে রায় দেন।
পশ্চিমবঙ্গের আইনপ্রণেতাদের বাংলা ভাগের পক্ষে রায় দেওয়ার ফলেই পরবর্তীতে বাংলা প্রদেশটি বিভক্ত হয়। মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ এবং হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই অধিবেশনে মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন ১১৩ জন, কংগ্রেসের ৮৭ জন, সিপিআই -এর ৩ জন এবং হিন্দু মহাসভার ১ জন (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি)। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ভোটাভুটিতে ৫৮-২১ ভোটে পশ্চিমবঙ্গের অংশে বাংলা ভাগের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবের পক্ষে এই ৫৮ জনের মধ্যে কংগ্রেসের ছিল ৫৫ জন, সিপিআই ২ জন ও হিন্দু মহাসভা ১ জন। এই হলো ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
দেশভাগ আটকানো না গেলেও বাংলা যাতে ভাগ না হয় তার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, আবুল হাশিমরা। কিন্তু হিন্দু মহাসভা বাংলা বিভাজনের দাবিতে অনড় থাকে। স্পষ্টতই বলা যায়, এই বিভাজন এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত ঘটনা৷ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং তৎপরবর্তী সময়ে দাঙ্গা, বিদ্বেষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক উদ্বাস্তু সমস্যা দুই বাংলার ইতিহাসে এনেছে দুঃখজনক অধ্যায়।
স্বাধীন ভারতে হিন্দু নারীদের আইনি অধিকার দেওয়ার হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করেছিল হিন্দু মহাসভা। এই বিলে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ বন্ধ ও বিবাহবিচ্ছেদের কথা আসে। আর আসে পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকারের কথা। বিলের বিরোধিতা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এককথায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ও অন্যান্য সংঘ পরিবারের নেতৃত্বের মতো ব্রিটিশদের অনুচর। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শিল্পপতি ঘনশ্যাম দাস বিড়লার অনুগত ছিলেন।
১৯৫১ সালে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় জনসংঘ (বা জন সঙ্ঘ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে এটি অন্যান্য দলের সাথে মিশে গিয়ে ‘জনতা পার্টি’ গঠন করে এবং পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে এই সংগঠনের মূল নেতারা বেরিয়ে এসে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) প্রতিষ্ঠা করেন। এরা আরএসএস, হিন্দু মহাসভার আদর্শে পরিচালিত। এই শ্যামাপ্রসাদকেই বাংলার মুখ করে তুলছে বিজেপি। আজ শ্যামাপ্রসাদদের উত্তরসূরিরাই নাগরিকদের দেশভক্তির পরিচয় তলব করছেন। প্রশ্ন করাকে দেশদ্রোহিতা বলছেন। ভারতের মুসলিমদের বাংলাদেশ, পাকিস্তান পাঠানোর নিদান দিচ্ছেন।
অতএব, বিজেপি-আরএসএসের পূর্বসূরীরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যেসব বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেগুলোকে ঢাকতে আজ রাজ্য সরকার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-কে সামনে তুলে ধরেছে। তাই হিন্দুত্ববাদী ব্রিটিশ অনুচর সাভারকরের মতোই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-কে পঃবঙ্গের রূপকারের আসনে বসানোর এই প্রচেষ্টা হল ইতিহাসের চূড়ান্ত মিথ্যাচার ও ভন্ডামির নামান্তর!
————————
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

