আশিস কুমার ঘোষ, কলকাতা

প্রতিটি জীবনরক্ষা শুরু হয় সময়ের সঙ্গে এক নিরবচ্ছিন্ন লড়াই দিয়ে। সেই লড়াইয়ের প্রথম সারিতে থাকেন অ্যাম্বুল্যান্স চালকেরা—যাঁরা বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা ও তীব্র চাপের মধ্যেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালান। এই নীরব নায়ক ও তাঁদের পরিবারের আত্মত্যাগ ও অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে বুধবার বিশ্ব অ্যাম্বুলেন্স দিবস উদযাপন করল মণিপাল হাসপাতাল, কলকাতা। আয়োজন করল এক বিশেষ উদ্যোগ—‘Salute the Real Heroes Family’। এদিন এই উদ্যোগের মাধ্যমে চিকিৎসা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম সাড়া দেওয়া অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতাকে সম্মান জানানো হয়—যাঁরা বহু সময় জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি, তাঁদের পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, যাঁরা অনিয়মিত ও কঠিন কর্মসূচির মাঝেও নীরবে পাশে থেকে এই মহান দায়িত্বকে সম্ভব করে তোলেন।

এদিন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের মাধ্যমে। এরপর অ্যাম্বুল্যান্স চালক ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ওয়েলনেস প্ল্যান ও প্রিভিলেজ কার্ড-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পরে এক সম্মাননা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত করা হয় দায়িত্বনিষ্ঠা ও নিরলস পরিষেবার জন্য নির্বাচিত অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচালনায় বেসিক লাইফ সাপোর্ট (BLS) প্রশিক্ষণ, যা চালকদের জরুরি অবস্থায় জীবনরক্ষার দক্ষতাকে আরও সক্ষম করে তোলে। পাশাপাশি, জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে মণিপাল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে একটি তথ্যভিত্তিক শিবিরের আয়োজন করা হয়। এরপর একটি অ্যাম্বুল্যান্স র‍্যালির সূচনা করা হয়, যা দ্রুততা, প্রস্তুতি ও জীবনরক্ষার তাগিদকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। এই নায়কদের পেছনের নীরব শক্তিকে সম্মান জানিয়ে পরিবারকেন্দ্রিক খেলাধুলা ও আনন্দঘন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডা. কিশেন গোয়েল, কনসালট্যান্ট ও হেড–ইমার্জেন্সি, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে; ডা. ইন্দ্রনীল দাস, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও ইন-চার্জ–ইমার্জেন্সি মেডিসিন, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস; ডা. সৌরভ দাস, কনসালট্যান্ট–ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস; ডা. সুজয় দাস ঠাকুর, কনসালট্যান্ট ও ইন-চার্জ–ইমার্জেন্সি মেডিসিন, মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুর; ডা. শুভাশিস দেব, কনসালট্যান্ট–কার্ডিওলজি, মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুর; ডা. ওসামা আশফাক, কনসালট্যান্ট–ইমার্জেন্সি মেডিসিন, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া; অধ্যাপক (ডা.) রাখী সান্যাল দত্ত শর্মা, সিনিয়র কনসালট্যান্ট–ইন্টারনাল মেডিসিন, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে—সহ অন্যান্য বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা।

অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যে ডা. কিশেন গোয়েল বলেন, ‘জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুল্যান্স চালকরাই অনেক সময় রোগীর প্রথম চিকিৎসা সংস্পর্শ। তাঁদের শান্ত উপস্থিতি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ বাঁচায়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে চাই এবং স্বাস্থ্য পরিবেশে তাঁদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা পুনরায় তুলে ধরতে চাই। ভারতে চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ার কারণে বহু ক্ষেত্রে ফলাফল গুরুতরভাবে প্রভাবিত হয়—বিশেষত কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশেরও বেশি রোগী দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছান। দুর্ঘটনা বা হৃদ্‌রোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো হস্তক্ষেপ জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। BLS প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলছি। জীবনসংকট মোকাবিলায় দক্ষ বাহিনী তৈরি করাই মণিপাল হাসপাতালের অঙ্গীকার।’
ডা. ইন্দ্রনীল দাস বলেন, ‘চিকিৎসা জরুরি অবস্থায় প্রশিক্ষিত একজন মানুষই জীবন ও মৃত্যুর ফারাক গড়ে দিতে পারেন। ‘Salute the Real Heroes’ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের প্রয়োজনীয় BLS প্রশিক্ষণ দিয়ে জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছি। একই সঙ্গে আমরা বুঝি, তাঁদের অবদান কেবল পেশাগত দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারকে সম্পৃক্ত করা ও হেলথ কার্ডের মাধ্যমে তাঁদের সামগ্রিক সুস্থতার দিকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। পেশাগত দক্ষতা ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে তাঁদের ক্ষমতায়নই আমাদের লক্ষ্য।’ ডা. সুজয় দাস ঠাকুর বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা দুর্ঘটনার মতো সংকটময় পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্স চালকরাই প্রথম সাড়া দেন। গোল্ডেন আওয়ারে তাঁদের দ্রুত সিদ্ধান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল একদিকে তাঁদের প্রয়োজনীয় দক্ষতায় সজ্জিত করছে, অন্যদিকে তাঁদের পরিবারকেও বাস্তব ও অর্থবহ সহায়তা দিচ্ছে। চালক ও তাঁদের প্রিয়জন—উভয়কে সম্মান জানিয়ে আমরা জরুরি চিকিৎসার পেছনের সেই অদৃশ্য শক্তিকে স্বীকৃতি দিচ্ছি, যা রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর অনেক আগেই জীবনরক্ষার সূচনা করে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত মার্স অ্যাম্বুল্যান্সের চালক ৩৪ বছর বয়সি সরজিৎ যাদব, যিনি গত আট বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত বলেন, ‘সবচেয়ে সংকটজনক মুহূর্তে রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব। এই উদ্যোগের জন্য এবং আমাদের ২৪ ঘণ্টা নিরলস পরিষেবাকে স্বীকৃতি জানানোর জন্য আমরা মণিপাল হাসপাতালের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এখানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমরা সত্যিই গর্বিত।’ অন্যদিকে, এক অ্যাম্বুল্যান্স চালকের স্ত্রী সারিকা সাহা বলেন, ‘খুব অল্প বয়স থেকেই আমার স্বামী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। আমাদের ৮ ও ৫ বছরের দুই মেয়ে প্রায়ই বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে পারে না তাঁর দায়িত্বের কারণে। আজ মণিপাল হাসপাতালের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের সন্তানরা সত্যিই বুঝতে পেরেছে—মানুষের জীবন বাঁচাতে তাঁদের বাবার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে থাকতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত।’

165 Views