নোটন কর
ছবি : পার্থ মিত্র
অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাকটিভিটিজ বিল, ২০২৬’ এবং সেই সঙ্গে পুরনো আইন সংশোধন করে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ গত ২৯ জুন রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়েছে। গুন্ডামি রুখতে কড়া আইনে এ বার পুলিশ-প্রশাসনকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও এই বিলে রাখা হয়েছে। প্রথম বিলটি, ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল’ যা ‘গুন্ডা দমন’ বিল নামে পরিচিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিলটি ‘পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিল যা ১৯৭২ সালের একটি আইনকে সংশোধন করে আনা হয়েছে। ‘গুন্ডা দমন’ বিল আইন হয়ে উঠলে নেহাতই সন্দেহের বশে যে কোনও ব্যক্তিকে আটক করতে পারবে পুলিশ। কোন সূত্রের বা তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে, তা জানাতে পুলিশ বাধ্য থাকবে না। সন্দেহভাজনকে আটক রাখা যাবে এক বছর। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক যে কোনও জায়গায় তল্লাশি চালাতে পারবেন। আটক ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন না। ওই আইনে আটক ব্যক্তির শুনানি হবে একটি অ্যাডভাইজারি বোর্ডে। সেই বোর্ডে অভিযুক্ত তাঁর পক্ষে সওয়াল করার জন্য কোনও আইনজীবী কিংবা প্রতিনিধি রাখতে পারবেন না। এমন আরও কিছু দানবীয় ধারা, এই আইনে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিলটিতে বলা হয়েছে, যদি কোথাও ভাঙ্গচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বা অন্য কোনভাবে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা হয় তাহলে দোষীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেখান থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।
এই বিলের আশঙ্কাজনক দিক হলো, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে, কেউ অপরাধ করতে পারে এই ধারণা থেকে অভিযুক্তকে পুলিশ আটকে রাখতে পারবে। গুন্ডা দমন বিলে সরকারের আসল লক্ষ্য গুন্ডা দমন নয় – লক্ষ্য বিকাশমান গণ-আন্দোলন ধ্বংস করা। আন্দোলনকারীদের জেলে পোরা। আমাদের দেশের আইনে বলা আছে, আগে নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার, তারপর বিচার, তারপর শাস্তি। এখানে সেই মৌলিক নীতি মানার কোনও বালাই নেই। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞা। সেখানে বলা হয়েছে – যে কোনো কাজ, যা জনসাধারণ বা জনতার কোনো অংশের মধ্যে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, কিংবা যার সম্ভাবনা রয়েছে! এখন প্রশ্ন হচ্ছে; কার কাজে কে আতঙ্কিত হবে? যদি শ্রমিকের ধর্মঘটে মালিকপক্ষ আতঙ্কিত হয়? যদি কৃষকদের জমি আন্দোলনে কর্পোরেট স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়? যদি ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষোভে শাসকদলের নেতারা আশঙ্কিত হয়ে পড়েন? কেউ যদি সরকার বিরোধী বক্তব্য রাখেন! যদি কোনও শিল্পী সাহিত্যিক কবি, সরকার বিরোধী মতপ্রকাশ করেন! তাহলে কি সেই আন্দোলন ও মতপ্রকাশ সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হয়ে যাবে? বিলের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেই আশঙ্কা থাকছে। এই আইনের মাধ্যমে সরকার যত না গুন্ডা বা সমাজবিরোধী দমন করতে চাইছে তার থেকে বেশি সরকার বিরোধী মতপ্রকাশ স্তব্ধ করতে চাইছে। অর্থাৎ বিচার নয়, প্রমাণ নয়, আদালতের রায় নয়; সামাজিক প্রচার, প্রশাসনিক ধারণা কিংবা রাজনৈতিক অপপ্রচারই একজন নাগরিকের পরিচয় নির্ধারণ করবে। এই সংজ্ঞা আইনের নয়; এটি গণমাধ্যমের শাসকের স্টুডিও-নির্মিত ‘জনরোষ’-এর ভাষা। আমাদের রাজ্যে গুন্ডা বা সমাজবিরোধী দমনে অনেক আইন আছে তার জন্য নতুন আইন আনার কোনও প্রয়োজন ছিল না। এই আইনের মূল লক্ষ্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সরকার বিরোধীদের দমন করা।
ঔপনিবেশিক আমলে রাওলাট আইন, স্বাধীনতার পরে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন আইন, মিসা, টাডা, পোটা, ইউএপিএ; প্রতিটি আইনই জাতীয় নিরাপত্তার নামে আনা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার বড় অংশের প্রয়োগ হয়েছে রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক নেতা, কৃষক আন্দোলন, ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে। গণআন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিচার ব্যবস্থার উপরে প্রতিষ্ঠা করা; এই প্রবণতাগুলো স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আগামীদিনে শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরির দাবিতে ধর্মঘট করেন, কৃষক যদি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন, ছাত্র ছাত্রী যদি বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন কিংবা সাধারণ মানুষ যদি দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন; তবে তাঁদের বিরুদ্ধেও ‘জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি’ ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অভিযোগ আনা হবে। প্রশাসন যদি নিজেই নির্ধারণ করে দেয় কোনটা রাজনৈতিক বিরোধিতা আর কোনটা নয়, তবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই আইন হচ্ছে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হলো- মানুষ যেন তাঁর বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ জানতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করতে পারে। এই বিল সেই মৌলিক নীতিকেই লঙ্ঘন করেছে।
এই আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা নিয়ে সরব হয়েছেন রাজ্যের গণতান্ত্রিক মানুষ, মানবাধিকার কর্মীরা এবং বিরোধী দলগুলি। এই দানবীয় আইনের বিরুদ্ধে জনগণকে তাঁরা লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন।
———————————–
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

