নোটন কর

খাবার-দাবার, জামাকাপড়, এমনকি বিছানাপত্র সঙ্গে নিয়ে মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরম, হরদা, রায়সেন, সেহোর ও ইটারসি-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানী ভোপালে বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন দুই হাজারের বেশি ক্ষুব্ধ কৃষক। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে গত ২৮ জুলাই (মঙ্গলবার) রাতে তাঁরা ভোপালের সীমান্তে প্রবেশ করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ঘেরাও করা। মুগ ডাল কেনা, সার বন্টন এবং জটিল ‘ই-টোকেন’ (e-token) ব্যবস্থা বন্ধ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার (Samyukta Kisan Morcha) নেতৃত্বে। আন্দোলনে সামিল হয়েছিল তরুণ প্রজন্মের জেন জি-র (Gen Z) ছাত্ররা।

কৃষকদের প্রধান দাবি ছিল, মধ্যপ্রদেশ সরকারকে উৎপাদিত মুগ ডালের ১০০ শতাংশ কিনতে হবে। বর্তমানে মাত্র ২৫ শতাংশ ফসল সরকারিভাবে কেনা হয়। এ বছর রাজ্যে রেকর্ড ২০.১৬ লাখ মেট্রিক টন মুগ ডাল উৎপাদন হলেও সরকার মাত্র ৪.৫৪ লাখ মেট্রিক টন কেনার অনুমতি দিয়েছে। ফলে একর প্রতি অতিরিক্ত ফসল মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা কুইন্টাল দরে খোলা বাজারে বেচতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা, যেখানে সরকারি সহায়ক মূল্য (MSP) কুইন্টাল প্রতি ৮ হাজার ৭৮০ টাকা। এতে কুইন্টাল পিছু ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি সার ও ফসল বিক্রির ঝক্কি এড়াতে জটিল ই-টোকেন ব্যবস্থার সংস্কার বা বাতিল চান তাঁরা।

বর্তমানে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ফসল বিক্রি করতে হলে কৃষকদের আগে অনলাইনে টোকেন বুক করতে হয় এবং নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ফসল নিয়ে যেতে হয়। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থা আধুনিক বলে মনে হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। টোকেনের স্লটের উপর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। কমিশনের বিনিময়ে তাঁরা কৃষকদের সেই স্লট বিক্রি করছেন। যে কৃষকের স্মার্টফোন নেই বা যার গ্রামে এখনও ভালো ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছায়নি, তার কাছে এই তথাকথিত ‘ই টোকেন’-এ ফসল বিক্রি আসলে আরেকটি বন্ধ দরজা।

তৃতীয় দাবি হলো, জমির রেকর্ড অনুযায়ী সার বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরাও তাঁদের প্রাপ্য সার পান এবং বড় জমির মালিক বা প্রভাবশালী ডিলারদের হাতে অধিকাংশ মজুত চলে না যায়। অবশেষে টানা আন্দোলনের চাপে মধ্যপ্রদেশ সরকার গত ৩০ জুলাই, কৃষকদের কিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। সরকার ডাল কেনার ঊর্ধ্বসীমা ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করতে বাধ্য হয়েছে। পুরোটাই কুইন্টাল প্রতি সহায়ক মূল্য ৮,৭৮০ টাকা দরেই কৃষকদের কাছ থেকে কিনবে রাজ্য সরকার। ফসল কেনার সময়সীমা আরো ১০ দিন বাড়াতেও বাধ্য হয়েছে সরকার। মধ্যপ্রদেশে সার বন্টন এবং ফসল বিক্রির জন্য এতদিন যে ডিজিটাল ‘ই-টোকেন’ ব্যবস্থা চালু ছিল, রাজ্য সরকার সেই ব্যবস্থাটিও সম্পূর্ণ স্থগিত করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

সরকারের এই প্রতিশ্রুতির পর কৃষকরা আপাতত আন্দোলন তুলে নিয়েছে। এবং বাকি দাবিগুলি সম্পূর্ণ করতে সরকারকে কিছুদিন সময় দিয়েছেন। যদি সরকার এরমধ্যে দাবিগুলো পূরণ না করে তবে আগামীদিনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন কৃষক নেতৃত্ব। এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি গত চার বছর ধরে পূরণ না হওয়ায় আগামী ১০ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সংযুক্ত কৃষক মোর্চা। সারা ভারতের ছাত্র-যুবরা পথে নেমেছেন, রাস্তায় আছেন কৃষকরাও। শ্রমিকশ্রেণি, ছাত্রযুব এবং শ্রমজীবী মানুষের এই ঐক্যবদ্ধতাই হল শাসকের ভয়ের কারণ।

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

120 Views