ওয়েব ডেস্ক : অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে আমাদের দেশে ৩,০০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রায় ১,২৮,৩৩৪টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ৪২.৫ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এ বছর এখনও পর্যন্ত ভারতে ৪৭,২৪৪টি গবাদি পশুও মারা গেছে।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের ৯২ শতাংশ দিনই অস্বাভাবিক বা চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। নয়াদিল্লি-ভিত্তিক জনস্বার্থ গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই) এবং ডাউন টু আর্থ (ডিটিই) কর্তৃক ৪ নভেম্বর প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, ভূমিধস, বন্যা এবং ভারী বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনায় ৩,২২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, দেশজুড়ে জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে এবং ভারতের জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান মানবিক মূল্য উন্মোচিত হয়েছে।

‘ক্লাইমেট ইন্ডিয়া ২০২৬: অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অফ এক্সট্রিম ওয়েদার ইভেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যেকার প্রবণতাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, চরম আবহাওয়ায় প্রভাবিত দিনের হার ২০২২ ও ২০২৩ সালে ৮৬-৮৮% থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৯৩% হয়েছে এবং ২০২৫ সালে তা সর্বোচ্চ ৯৯%-এ পৌঁছেছে। এই সর্বশেষ পরিসংখ্যান ভারতের জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান মানবিক মূল্যকে তুলে ধরে। এই বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে, ২৭৩ দিনের মধ্যে ২৫১ দিনই চরম আবহাওয়ার সম্মুখীন হয়েছে দেশ, যার অর্থ প্রায় ৯২% দিনেই ভারতের অন্তত একটি অংশ প্রভাবিত হয়েছে।

পাঁচ বছরে ১৬,০০০ এরও বেশি মৃত্যু

সিএসই-র প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতে চরম আবহাওয়ার কারণে ১৬,০০০-এরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার প্রায় ৬৫ ​​শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে গত তিন বছরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশে চরম আবহাওয়া প্রায় দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে, প্রতি বছর জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়কালে ৮৬-৯৯ শতাংশ দিনই অস্বাভাবিক বা চরম আবহাওয়ার সম্মুখীন হয়েছে ভারত। এই মূল্যায়ন সময়কাল জুড়ে বার্ষিক মৃতের সংখ্যা ২,৭০০-এর উপরেই থেকেছে, যা ২০২২ সালে ২,৭৫৫ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২,৯২৩ এবং ২০২৪ সালে ৩,২৩৮ হয়েছে। ২০২৫ সালে মৃতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪,০৬৪-তে পৌঁছেছিল, যা এই পাঁচ বছরের সময়কালের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চরম আবহাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই ৩,৩২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ডিটিই-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, দুর্যোগগুলোর মধ্যে ছিল বজ্রপাত ও বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি, ধূলিঝড় এবং স্কোয়াল (হঠাৎ করে অল্প সময়ের জন্য বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড শক্তিশালী বাতাস, যার সাথে প্রায়শই ভারী বৃষ্টি বা বজ্রঝড় থাকে)। এই মূল্যায়নটি ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি), কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতের কৃষকদের

এই ক্ষতি শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাঁচ বছরের এই সময়কালে, চরম আবহাওয়ার কারণে কমপক্ষে ২ কোটি ৬ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৮২ শতাংশেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে। কৃষি খাতে ক্ষতি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত আবাদি জমির পরিমাণ ২০২২ সালে ১৮.৪ লক্ষ হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৩২ লক্ষ হেক্টর হয় এবং এরপর ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে ৯৪.৭ লক্ষ হেক্টরে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে আরও ৪২.৫ লক্ষ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা এই মূল্যায়ন সময়কালে কৃষি ক্ষতির দিক থেকে এটিকে দ্বিতীয়-সবচেয়ে খারাপ বছরে পরিণত করেছে। প্রতিবেদনে আবহাওয়ার পরিবর্তিত ধরনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে শীতকাল উষ্ণতর হচ্ছে এবং তাপপ্রবাহ আগেভাগেই চলে আসছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি ছিল গত ১২৫ বছরের মধ্যে চতুর্থ-উষ্ণতম ফেব্রুয়ারি এবং পাঁচ বছরের এই মূল্যায়ন সময়কালে প্রথমবারের মতো কোনো শৈত্যপ্রবাহ বা শীতল দিনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। মার্চের শুরুতে হিমাচল প্রদেশ একটি তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়, যা এই মূল্যায়নের সময়কালে নথিভুক্ত হওয়া সবচেয়ে দ্রুততম ঘটনা। এর প্রভাব ব্যাপক। গত পাঁচ বছরে মধ্যপ্রদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক চরম আবহাওয়ার দিন নথিভুক্ত হয়েছে, যা ৭৪৮ দিন। এর পরেই রয়েছে হিমাচল প্রদেশ (৭৪০), উত্তর প্রদেশ (৬৫৩), মহারাষ্ট্র (৬৪৮) এবং আসাম (৫২৬)। এই বছর, উত্তর প্রদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে, যা ৮১১ জন। এর পরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র (২৮৬) এবং বিহার (২৪৫)। মহারাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে, যেখানে ২৮.৩ লক্ষ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বারবার খরা, ক্রমবর্ধমান কৃষি ক্ষতি এবং কৃষক আত্মহত্যার কারণে রাজ্যের কৃষি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মানবিক ক্ষতির এক ভয়াবহ স্মারক হিসেবে, ‘দ্য ওয়্যার’-এর এই প্রতিবেদন অনুসারে, গত ছয় দিনে মহারাষ্ট্রে অন্তত ১০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।

অস্বাভাবিক বা চরম জলবায়ু যগের জন্য প্রস্তুত হতে হবে ভারতকে

সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই)-এর মহাপরিচালক সুনিতা নারাইন ক্রমবর্ধমান এই ক্ষয়ক্ষতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের মানবিক মুখ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দেশের প্রায় প্রতিটি অংশই চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হচ্ছে।

এক বিবৃতিতে নারাইন এই সংকটের পেছনে থাকা বৃহত্তর জলবায়ুর প্রতি অবিচারের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। ধনী দেশগুলি, যারা ঐতিহাসিকভাবে কার্বন নিঃসরণের জন্য অতিমাত্রায় দায়ী, তারা যথেষ্ট দ্রুত দূষণ কমাতে পারেনি, কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলিকে জলবায়ু স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থায়নও দিতে পারেনি।

ডাউন টু আর্থ-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক রিচার্ড মহাপাত্র দুর্যোগের পরে সাড়া দেওয়ার বাইরে গিয়ে ঝুঁকি কমানো এবং সহনশীলতা তৈরির উপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ডাউন টু আর্থ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, জল পুনর্ভরণ পরিকাঠামো এবং বন ও সবুজ অঞ্চল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।

মাত্র পাঁচ বছরে ১৬,০০০-এর বেশি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ায়, এই তথ্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এই সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সারি হিসেবে দেখা যাবে না। চরম আবহাওয়ার ক্রমবর্ধমান ঘটনা জীবন, জীবিকা এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে, ফলে প্রস্তুতি, জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাস আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠছে।

সূত্র : দ্য ওয়ার ডট কম (thewire.com)

71 Views