নোটন কর

ক্যালেন্ডারের পাতায় কিছু কিছু দিন আছে, যেগুলো ইতিহাসে সাধারণ তারিখ নয়। এগুলো একটি জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয়, বেদনা ও গভীর আত্মসমালোচনার প্রতীক। ২৩ জুন বাঙালি জাতির ইতিহাসে তেমন একটি দিন। দিনটি উদযাপিত হয় ‘পলাশী দিবস’ হিসেবে। ১৭৫৭ সালের এদিনে পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত এক যুদ্ধে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাংলার তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ পরাজিত হন। এই পরাজয় শুধু একজন নবাবের পতন ছিল না; ছিল সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যবদলের এক অন্ধকার সূচনা।
ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্ব ভারতে প্রথমে ব্যবসা করতে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শ্রীবৃদ্ধি শুরু হয় সম্রাট শাহজাহানের সময়াকালে। ১৬৫১ সালে কোম্পানি হুগলিতে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। বাংলার সুবেদার শাহজাদা শুজা মাত্র তিন হাজার টাকা বাৎসরিক করের বিনিময়ে ইংরাজদের প্রদেশের সর্বত্র অবাধ বাণিজ্যের অধিকার দেন। এই বিরাট সুবিধা লাভ করার ফলে ইংরাজ বণিকরা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার বন্দর ও শহরগুলিতে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দ্রুত বৃদ্ধি বা উন্নতি লাভ করে এবং ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার ফলে কোম্পানির ধূর্ত বণিকরা রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশেরও সুযোগ পেয়ে যায়।
মাতামহ নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর, ১৭৫৬ সালে মাত্র তেইশ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলাহ বাংলার মসনদে বসেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর এই তরুণ নবাবকে বহু রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়। একদিকে পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে বাংলায় বাণিজ্য করার জন্য আগত ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান চক্রান্ত ও ঔদ্ধত্য। এক সময় তিনি উপলব্ধি করেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রকৃত লক্ষ্য ছিল শুধু ব্যবসা নয়- বাংলার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখল করা। এই উপলব্ধি থেকে তিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। কিন্তু ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একে সিরাজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ এবং বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি পলাশীর ঘটনা।
২৩ এপ্রিল ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল নবাব সিরাজউদ্দৌলাহকে সিংহাসনচ্যুত করবার জন্য এক প্রস্তাব পাস করে। নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বস্ত ছিলেন না। কয়েকবার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাঁকে শাস্তি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে নবাব ক্ষমা করে দেন এবং পুনরায় সেনাপতি পদে বহাল করেন। কারণ মীরজাফর ছিলেন আলীবর্দীর ভগ্নিপতি। মুর্শিদাবাদের মসনদের ওপর তাঁর ছিল লোভ, এজন্যই তিনি সিরাজের বিরুদ্ধাচারণ থেকে কোনও সময় নিজেকে সরিয়ে আনতে পারেননি। সকল ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯ মে, জগৎশেঠের বাড়িতে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায় দুর্লভ, মীরজাফর, রাজবল্লভ এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট ওয়াটস্। এই বৈঠকে সিরাজউদ্দৌলাহকে সরিয়ে মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৩ জুন, কলকাতা থেকে যুদ্ধের জন্য যাত্রা করে ২২ জুন, পলাশী প্রান্তরে উপস্থিত হল ক্লাইভের সৈন্য বাহিনী। তাঁর সঙ্গে ছিল ২,১০০ ভারতীয় সৈন্য ও ১,১০০ গোরা সৈন্য আর অন্যদিকে নবাবের ছিল ৫০,০০০ সৈন্য ও ৫৩টি কামান। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ জুন বিকেলে পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। মীরজাফর উমিচাঁদ, জগৎ শেঠের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত হন। নবাবের দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদন ও মদনলাল শেষপর্যন্ত লড়াই করে প্রাণ ত্যাগ করেন। অবশেষে নবাব বন্দি হন এবং মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে ২ জুলাই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবেই চব্বিশ বছর বয়সে নবাবের জীবনাবসান ঘটে।
ইতিহাসবিদ ড. নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন- পলাশীর যুদ্ধ প্রকৃত অর্থে কোনও যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সফল পরিণতি। তাকে পরাজিত করেছিল চারপাশের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও ক্ষমতালোভী অভিজাত শ্রেণি।
নবাবের মৃত্যু একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, এটি ছিল বাংলার স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যের এক দীর্ঘ, অন্ধকার ও শোষণের অধ্যায়। তাই পলাশী যুদ্ধের ইতিহাস যতবার আলোচিত হয়, ২৩ জুন, ততবার ঔপনিবেশেক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সিরাজের প্রতিরোধ আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে।
স্বার্থপর দেশীয় অর্থলোলুপ ক্ষমতালোভীদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী পররাজ্যগ্রাসীদের ষড়যন্ত্র চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ। পলাশীর ষড়যন্ত্র ও তার জন্য ভারতের তথা বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এই যুদ্ধের ফলে বাংলার জীবনে এক ঘোরতর দুর্দিন নেমে আসে। পলাশী-পরবর্তীতে কোম্পানির লুণ্ঠনের ফলে বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। বাংলার জনগণের দুঃখ দুর্দশার অন্ত ছিল না। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, কোনও রাষ্ট্র কেবল বাইরের শত্রুর আক্রমণে দুর্বল হয় না। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ব্যক্তিস্বার্থ, দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিজেদের কুৎসিত চক্রান্তও একটি জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পলাশীর ঘটনা যার জ্বলন্ত প্রমাণ।
আজ ভারতবর্ষে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বদলে রয়েছে আদানি আম্বানি কর্পোরেট কোম্পানি। আর মীরজাফর, উমিচাঁদ, জগৎ শেঠদের পরিবর্তে রয়েছে শাসকশ্রেণি। যারা আদানি আম্বানি ও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে। ইংরেজরা যেভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার নামে ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি নিয়ে দেশ শাসন করেছে, বর্তমান শাসকদল ঠিক সেইভাবে ইংরেজদের রেখে যাওয়া নীতি নিয়ে দেশ শাসন করতে চাইছে। আজকে ভারতবাসীকে পলাশীর প্রতিরোধ দিবসকে স্মরণে রেখে দেশ বিক্রি রুখতে লড়াইয়ের পথে নামতে হবে।
——————–
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী

107 Views