নোটন কর
দীর্ঘ তিন দশকের একচ্ছত্র আধিপত্যে ইতি টেনে বিজেপির অপ্রতিরোধ্য দুর্গে বড়সড় ধস নামাল জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তথা রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোর। বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীকে ১৯,৩২৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিলেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই শক্তঘাঁটিতে এমন ভরাডুবি বিজেপির জন্য এক মস্ত বড় ধাক্কা।
বাঁকিপুর যদি এক প্রতীকী ধাক্কা বুঝিয়ে থাকে, তবে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া সেই রাজনৈতিক বার্তাটিকেই আরও জোরালো করে তুলেছে। মধ্যপ্রদেশের এই আসনে লড়াই বাঁকিপুরের মতো রাজনৈতিক দিক থেকে অতটা প্রতীকী গুরুত্ব বহন না করলেও, এটি কংগ্রেস দলকে বিজেপি শাসিত রাজ্যে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে, যেখানে ২০২০ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে তারা একটি জোরদার রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলতে লাগাতার লড়াই করছিল। দাতিয়া কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং ভোট পেয়েছেন ৬৬,৭৫৭টি। বিজেপির আশুতোষ তিওয়ারি পেয়েছেন ৬০,৭৪১টি। সিং ৬,০১৬টি ভোটের ব্যবধান জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, গুজরাতের ভাদোদরা জেলার মাঞ্জলপুর বিধানসভা আসনটি বিজেপি তাদের দখলেই রেখেছে। দলের প্রার্থী সতীশ গোবিন্দভাই প্যাটেল উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, কংগ্রেস প্রার্থী ও প্রাক্তন মন্ত্রী ভিখাভাই রাবারিকে ৩০,৬৩০ ভোটে পরাজিত করে। গত নির্বাচনে এই আসনে বিজেপি প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটে জিতেছিল।
বিধানসভার তিন আসনে উপনির্বাচন হয় গত ৩০ জুলাই। এই তিনটির মধ্যে বিহারের বাঁকিপুরের দিকে নজর বেশি ছিল অনেকগুলো কারণে। প্রথমত, ওই কেন্দ্রটি বরাবর বিজেপির দুর্গ বলে পরিচিত। পরপর পাঁচবার সেখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন নীতীন নবীন, যিনি এখন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। বিধানসভা ছেড়ে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন বলেই সেখানে উপনির্বাচন হলো। নীতীনের আগে ওই কেন্দ্র থেকে জিতে তিনবার বিধায়ক হয়েছিলেন তাঁরই বাবা নবীন কিশোর। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির কাছে বাঁকিপুর ধরে রাখা ছিল সম্মানের লড়াই।
এই নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৩৪.৩০%। গত নভেম্বর (২০২৫)-এর বিধানসভা নির্বাচনেও এই আসনে তৎকালীন বিজেপি প্রার্থী নিতিন নবীন ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। সোমবারে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, নিজের প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমে প্রশান্ত কিশোর পান ৬৪,১৫১টি ভোট। অন্যদিকে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিংহ পান ৪৪,৮২৭টি ভোট। অনেক পেছনে থেকে তৃতীয় স্থানে শেষ করেন আরজেডি প্রার্থী রেখা কুমারী, যাঁর ঝুলিতে গেছে মাত্র ১৪,২৭৩টি ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য বিধানসভায় এনডিএ-র সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকলেও, বিজেপির খাসতালুকে প্রশান্ত কিশোরের এই জয় বিহারের আগামী রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উপনির্বাচনের এই ফলের জন্য নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহকে দলে অনেক অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এবারের উপনির্বাচন নজর কেড়েছিল একটাই কারণে, জেন জি-দের ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রবল আন্দোলনের চাপে প্রতাপান্বিত নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতজানু হওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করার পর এই প্রথম দেশে কোনও নির্বাচন হলো। স্বাভাবিক কারণেই সবাই দেখতে চেয়েছে, তিন রাজ্যে ‘জেন-জির’ সমর্থন কোন দিকে যায়। ফলপ্রকাশের পর বোঝা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির বলিরেখা আরও গাঢ় হতে চলেছে। কারণ, আধুনিক প্রজন্মের পাশাপাশি বিজেপির উচ্চবর্ণের ভোটব্যাংকেও এবার ধস নেমেছে। না হলে বাঁকিপুরে তাদের এমন পদস্খলন হতে পারে না। জাতপাতের সমীকরণে বাঁকিপুর কেন্দ্রে কায়স্থ ভোট প্রায় ২০ শতাংশ। এরমধ্যে নিতীন নবীন ও স্থানীয় সাংসদ রবিশংকর প্রসাদ দুজনেই কায়স্থ। বিজেপি নেতারা ভেবেছিল বরাবরের মতো কায়স্থ সমাজের সমর্থনেই বাজিমাত হবে। কিন্তু ঐ দুই নেতা যে বুথে ভোট দেন, তাতেও হেরেছে বিজেপি। বাঁকিপুর কেন্দ্র নিয়ে বিজেপি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, ভোটের আগে সাংসদ রবি শংকর প্রসাদ মন্তব্য করেছিলেন, ‘ওখানে বিজেপির টিকিটে কুকুর বেড়াল দাঁড়ালেও জিতবে।’ ভোটাররা এই ঔদ্ধত্যের ভালভাবেই জবাব দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পর এই প্রথম বিহারের নতুন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে এটাই ছিল প্রথম ভোট। সেই ভোটে পরাজয় নিশ্চিতভাবেই বিজেপির দুশ্চিন্তার বোঝা বাড়াবে। তৃতীয় কারণটি গুরুত্বপূর্ণ বিজেপি বিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোটের’ জন্য। বাঁকিপুরে প্রার্থী দিয়েছিল রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়া জোটের বড় শরিক আরজেডি। কিন্তু তাদের ছাপিয়ে প্রশান্ত কিশোরের মাথাচাড়া দেওয়া বিরোধী মেরুকরণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের পক্ষে, যা অবশ্যই চিন্তার।
চতুর্থত, এই উপনির্বাচনগুলো বিরোধী ইন্ডিয়া জোটকে শিক্ষা দিল একজোট হয়ে এবং রুজিরুটির প্রশ্নে লড়াই করলে বিজেপির পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
এই উপনির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করে, কারণ এগুলো শাসক রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক দক্ষতার পরীক্ষা নেয়। অন্যদিকে প্রশাসন তাদের হাতে থাকে। ভোটের সময় অনৈতিক কাজকর্ম প্রশাসনকে দিয়ে শাসকদল করায়। কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের নামে প্রায় এক কোটি ভোটার বাদ দিয়ে নির্বাচন হয়েছে। দেশে উপনির্বাচনের এই ফলাফল বিজেপির ধ্বসের এক সূচনা বিন্দু বলা যেতে পারে।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

