ওয়েব ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া পরিচালনার সমালোচনা করেছে দেশের শীর্ষ তিনটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়। গত ১০ এপ্রিল তিনটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তেই পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া পরিচালনার সমালোচনা করেছে। এই প্রক্রিয়ায় ৯০ লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আরও ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বিচারাধীন থাকায় তাঁরা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। ওইসব সম্পাদকীয়তে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্বেগজনক পদক্ষেপ এবং বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার পর পরিচালিত একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

ভারতীয় গণতন্ত্রকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’। ‘দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা সত্ত্বেও একটি নবীন রাষ্ট্র ১৯৫১-৫২ সালে বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে, তারা কেবল প্রত্যেক নাগরিকের ভোটকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতেই সফল নয়, বরং এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে নির্বাচনের একটি স্বতন্ত্র মডেলও প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’ এই সংবাদপত্র বলেছে যে, ভারতীয় গণতন্ত্রের গভীর শিকড়ের যে কৃতিত্ব, তার একটি বড় অংশ নির্বাচন কমিশনের। আর একারণেই এই নির্বাচন সংস্থার বর্তমান কার্যকলাপ ‘অনেক বেশি উদ্বেগজনক’।

‘ভারতে, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য দায়বদ্ধ শাসন বিভাগ। অতীতে কিছু বিতর্ক থাকলেও, মূলত দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে টিএন সেশানের প্রবর্তিত ব্যাপক সংস্কারের পর তা করতে পেরেছে। প্ররোচনা যতই থাক না কেন, একের পর এক বিতর্কের মাধ্যমে এর সুনাম ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ পক্ষপাতিত্বের একটি ধারণা তৈরি করার হুমকি দিচ্ছে। এই হুমকি দেশের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করেছে। এর পরিবর্তে, নির্বাচন কমিশনের উচিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে তার সুপ্রতিষ্ঠিত সুনাম রক্ষা করার লক্ষ্যে কাজ করা।’

বিহারের এসআইআর-ও বিতর্কিত ছিল। আর পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়ার ফলে ব্যাপক বঞ্চনা ও ভোটাধিকার হরণ ঘটেছে। অন্যান্য রাজ্যের চিত্র ভিন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখ ভোটারকে একটি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ৬০ লাখের মধ্যে প্রায় ৩২.৬৮ লাখকে যোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২৭.১৬ লাখকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সংশোধনের আগের মোট সংখ্যার তুলনায় মোট ভোটার সংখ্যা ১১.৬১% কমে গেছে। এই ২৭ লাখ মানুষ এখন সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে গঠিত ১৯টি ট্রাইব্যুনালে যাবেন, যেখানে তাদের আবেদনের শুনানি হবে। তবে, ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার এবং ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটের মধ্যে তাদের আবেদনের শুনানি হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদনের বিষয়ে রাজ্যের আপিল ট্রাইব্যুনালগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোনও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি।

‘ডেকান হেরাল্ড’ তার সম্পাদকীয়তে বলেছে যে, সময়সীমা না থাকায় প্রতিকারের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা এখনও গতি পায়নি। ‘ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ ভোটারের অনুপস্থিতি নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এত বড় আকারে বাদ দেওয়ার পর পরিচালিত একটি নির্বাচন সুষ্ঠু বা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। আদালতের ওপরই এই দায়িত্ব বর্তায় যে, তারা হস্তক্ষেপ করে ব্যবস্থাটিকে পুনরায় ঠিক করবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেবে’।
অন্যদিকে, ‘দ্য হিন্দু’ তার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে যে, বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষোভ নির্বাচনী আখ্যানকে শাসনতান্ত্রিক বিষয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা থেকে সরিয়ে পরিচয়গত ইস্যুতে নিয়ে গেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এক উদাসীন নির্বাচন কমিশনের গৃহীত মূলত ত্রুটিপূর্ণ গণনা প্রক্রিয়ার কারণে এসআইআর এবং ভোটারদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য যে গুরুভার চাপানো হয়েছে, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের ক্ষোভ এখন নাগরিক ও শাসনতান্ত্রিক বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে নিজেই একটি নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’ ‘এসআইআর নিয়ে অসন্তোষকে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের চক্রান্তের ফল হিসেবে দেখিয়েছে তৃণমূল।অন্যদিকে, বিজেপি এসআইআর-কে ধর্মীয় ভিত্তিতে নির্বাচনকে মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। পশ্চিমবঙ্গের এখন এমন একটি শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত কৃষিভিত্তিক ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান-চালিত শিল্পোন্নয়নকে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায় তা নিয়ে, ভোটারদের ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিচয় নিয়ে নয়।’
সূত্র : দ্য ওয়ার ডট ইন (thewire.in)

181 Views