ওয়েব ডেস্ক : মধ্য কলকাতার ধর্মতলায় ২৪ জুলাই ছাত্র-যুবদের মিছিলকে কেন্দ্র করে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাজ্যের নতুন গুন্ডা-বিরোধী আইনের প্রথম প্রয়োগ ঘোষণা করার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ধর্ম-প্রভাবিত দুটি শব্দ ‘ফ্রাইডে পিপল’ বা ‘শুক্রবারের লোক’ ব্যবহার করেছেন। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির বিলুপ্তি এবং নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য জবাবদিহিতার দাবিতে আটটি বাম ছাত্র সংগঠনের ডাকে এবং ককরোচ জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ শাখা ও অন্যান্য গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এই মিছিলে বহু মানুষ পা মেলান। মূলত শান্তিপূর্ণ মিছিলটি ডোরিনা ক্রসিংয়ে পৌঁছোনোর পর গোলযোগ শুরু হয়। সেখানে পুলিশের দিকে জুতো, বোতল ও ইট ছোড়া হয় এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলেও খবর। বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন সাংবাদিক দ্য ওয়ারকে জানিয়েছেন যে, নারী সাংবাদিক-সহ অন্যান্য সাংবাদিকদের হেনস্থা ও গালিগালাজ করা হয়েছে। বিক্ষোভের ভিডিওতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন সাংবাদিকদের ঘিরে ধরেছে ও হেনস্থা করছে, সরাসরি সম্প্রচারে বাধা দিচ্ছে এবং অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছে। কয়েকজন সাংবাদিক শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন।

সূত্রের খবর, ভুল, চাঞ্চল্যকর বা সাম্প্রদায়িকভাবে উস্কানিমূলক প্রতিবেদন প্রচারের অভিযোগে অভিযুক্ত টেলিভিশন মিডিয়ার একাংশের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনরোষের প্রেক্ষাপটে এই হামলাগুলো ঘটেছে। বিক্ষোভকারীরা কিছু গণমাধ্যম সংস্থা কেন জনগণের আস্থা হারিয়েছে, তার উদাহরণ হিসেবে স্বতন্ত্র সাংবাদিকদের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন অডিও-ভিজ্যুয়াল সাংবাদিক ‘দ্য ওয়্যার’কে বলেছেন যে, হিংসার জন্য দায়ী গোষ্ঠীটির কোনও শনাক্তযোগ্য রাজনৈতিক চরিত্র আছে বলে মনে হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুল ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আমার কাছে জনতাকে রাজনৈতিক বলে মনে হয়নি। যখন আমাদের ধাক্কাধাক্কি করা হচ্ছিল, তখন কিছু রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্র আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তাঁরা আমাদের ঘিরে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করেন। তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁরা আরও বলেন যে, বাইরে থেকে একদল যুবক এসে তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ঝামেলা করছিল।’ ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আমি প্রতিবাদী ছাত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, যারা আমাদের অশেষ সাহায্য করেছে, আমাদের নিরাপদ রাখতে ঘিরে ধরেছিল এবং পুরো ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছে।’

স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই) এবং অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে তারা অভিযোগ করেছে যে, শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সহিংসতা ঘটানোর জন্য মিছিলে প্রবেশ করেছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মিছিল চলাকালে আমরা লক্ষ্য করি যে কিছু ব্যক্তি মিছিলে প্রবেশ করে বারবার এটিকে লাইনচ্যুত করার চেষ্টা করছে। তারা আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তর্কবিতর্কেও জড়িয়ে পড়ে। পরে, শাসকগোষ্ঠীর এইসব লোকজন সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের থামাতে গেলে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর হামলা করা হয়। সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে যে, এর পরপরই বিক্ষোভের ওপর পুলিশের হামলা শুরু হয়, এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তারা বলেছে, ‘আহত প্রত্যেক সাংবাদিককে আমরা বলতে চাই যে, আমরা আপনাদের পাশে আছি। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’
এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবঞ্জন দে অভিযোগ করেছেন যে, দুষ্কৃতিকারীদের বিজেপি পাঠিয়েছিল। এই মিছিলে ক্রমবর্ধমান ছাত্র জমায়েতের কারণে ধর্মতলা কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। সেই উত্তেজনার মধ্যে বিজেপির পাঠানো কিছু গুন্ডা গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। ‘দ্য ওয়্যার’ এই ঘটনার বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানতে কলকাতা পুলিশ কমিশনার অজয় ​​নন্দা-সহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাঁদের জবাব পেলে এই প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য
পুলিশ জানিয়েছে, ৭০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং সাতটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ছয়টি হেয়ার স্ট্রিট থানায় এবং একটি এন্টালিতে। অধিকারী বলেন, সদ্য আনা পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন, যা সাধারণত ‘গুন্ডা’ আইন নামে পরিচিত, তার বিধানগুলি এইসব মামলায় যুক্ত করা হয়েছে। এই কাজটা ওইসব ‘ফ্রাইডে পিপল’রাই করেছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টতই শুক্রবারে নামাজ পড়া মুসলিমদের প্রতি ইঙ্গিত ছিল। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে পাঁচজন অভিযুক্তের নাম বলেন, রাজাবাগানের আফরোজ, খিদিরপুরের নাহিদ, ইকবালপুরের তানভীর ও নিজাম এবং ওয়াটগঞ্জের রাহুল জামাল। তিনি বলেন, ‘গুন্ডা-বিরোধী আইনের অধীনে আমরা এমন ব্যবস্থা নেব যে এই গুন্ডাদের এক প্রজন্ম নয়, তিন প্রজন্ম তা মনে রাখবে।’ তাঁর ‘ফ্রাইডে পিপল’-এর উপর জোর দেওয়া এবং এরপর মুসলিম নামের অভিযুক্তদের বেছে বেছে নাম উল্লেখ করা, সরকারের প্রতিক্রিয়াকে একটি সুস্পষ্ট সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছে। উল্লেখ্য, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই) এবং ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকরা ২৪ জুলাই শুক্রবার কলকাতায় এই যৌথ প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করেছিল।

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর)-এর সহ-সভাপতি রঞ্জিত সুর অভিযোগ করেন যে, নতুন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্যই এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়। তাঁর অভিযোগ, সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের বিপুল অংশগ্রহণে বিরক্ত হয়ে সাম্প্রদায়িক মুখ্যমন্ত্রী এর জন্য দায়ীদের ‘শুক্রবারের লোক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। গুন্ডা-বিরোধী আইনে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তারা সবাই মুসলিম। পুরো ব্যাপারটিই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সরকার-পরিকল্পিত। যদিও উস্কানিদাতাদের সরকার কর্তৃক নিযুক্ত করা হয়েছিল বা তারা শাসকদলের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন দাবি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। সরকার ও পুলিশ উভয়েই দাবি করেছে যে, মিছিলে অংশগ্রহণকারীরারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। নতুন আইনটি বিনা বিচারে ১২ মাস পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক রাখার অনুমতি দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট এলাকা থেকে এক বছর পর্যন্ত সময়ের জন্য লোকজনকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা প্রশাসনকে দিয়েছে। এই আইনের ব্যাপক সংজ্ঞা এবং গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও বাজেয়াপ্ত করার বিস্তৃত ক্ষমতা রাজনৈতিক ভিন্নমতের বিরুদ্ধে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর সাংবিধানিক বৈধতা কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, কলকাতা প্রেস ক্লাবও সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। সভাপতি স্নেহাশীষ সুর এবং সম্পাদক কিংশুক প্রমাণিক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রতিবাদের নামে সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সৌজন্যে : দ্য ওয়ার এ লিখেছেন অপর্ণা ভট্টাচার্য। (thewire.in) অনুবাদ আমাদের।

57 Views