ওয়েব ডেস্ক : ভিন্নমতের ওপর বিধিনিষেধের কারণে ভারতে সংকুচিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিসর। বললেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। লাইভ ল-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, প্রতিবাদ ও মতামত প্রকাশের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করার জন্য ছাত্র, আন্দোলনকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্রমবর্ধমানভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
২৫ জুলাই ভোপালের ন্যাশনাল ল ইনস্টিটিউট ইউনিভার্সিটিতে (এনএলআইইউ) পঞ্চম বিচারপতি জি.পি. সিং স্মৃতি বক্তৃতায় বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, শান্তিপূর্ণ বিতর্ক এবং ভিন্নমত গণতন্ত্রের সারবস্তু, কিন্তু এর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস এবং কঠোর জামিনের শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। লাইভ ল-কে তিনি বলেন, একজন মন্ত্রী একজন কর্মরত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাকে ‘সন্ত্রাসীর কন্যা’ বলার পর, তার আচরণের বিষয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করার জন্য এফআইআর দায়ের করা হয় এবং তাকে আগাম জামিনের জন্য আবেদন করতে হয়। জামিন মঞ্জুর হয়, কিন্তু আদালত কী করে? তার পাসপোর্ট জমা দিতে বলে, অথচ তার পালিয়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকিই নেই। এরপর বলে, ফেসবুকে আর কিছু পোস্ট করবেন না।
সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ক্যাম্পাসে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে জামিন না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী জামিনের শর্ত আরোপ করার জন্য আদালতের সমালোচনা করেছেন। গঙ্গায় ইফতারের জন্য নৌকায় জড়ো হওয়া তরুণদের ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গঙ্গা নদীর উপর মুরগির মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করার কোনও আইন নেই; অথচ এই কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিন মাস জেলে থাকতে হয়। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, এমন একটি কাজের জন্য কি মানুষকে গ্রেপ্তার করে তিন মাসের জন্য জামিন থেকে বঞ্চিত করা যায়! নাগরিকরা দেখছে, সাধারণ মানুষ দেখছে।’ বিচারপতি মুম্বাইয়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ারও সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলনের জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং বিতর্ককে উৎসাহিত করার স্থান সেখানে থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘ভারত ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে; ভারতে আমাদের একটি ফিলিস্তিনি দূতাবাস রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ভারত সবসময়ই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে… [যদিও] দক্ষিণ আফ্রিকা সেখানে যা ঘটছে তার বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে আবেদন করেছে এবং এটিকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘ গাজার সহিংসতা তদন্তের জন্য উড়িষ্যা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মুরলীধরকে নিযুক্ত করেছে। তিনি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, যা জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে এবং এখন জনসাধারণের জন্য তা উন্মুক্ত। এই প্রতিবেদনে রাষ্ট্র কর্তৃক শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের ওপর চালানো সহিংসতার কথা বলা হয়েছে’, বিচারপতি ভূঁইয়া শ্রোতাদের বলেন।
বার অ্যান্ড বেঞ্চ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা প্রসঙ্গে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেছেন, ভারতের বাইরের ঘটনা নিয়ে মানুষ কেন প্রতিবাদ করতে চায়, একজন বিচারপতি এই প্রশ্ন তোলায় তিনি ‘খুবই হাস্যকর’ মনে করেছেন। ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির কথা উল্লেখ করে বিচারপতি ভূঁইয়া অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের পদত্যাগের পরপরই রাজনীতিতে প্রবেশের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সাংবিধানিক পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে তোলে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী কেশবানন্দ ভারতী রায়কেও সমর্থন করে এটিকে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং একই সঙ্গে এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জনসমক্ষে করা মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
যদি দুটি পা এক জায়গায় থাকে, তাহলে টুলটি ভেঙে পড়বে। এটাই মৌলিক নীতি। তাই, যখন ভারতের একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বলেন যে, তিনি বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ব্যবধান ঘোচাতে রাজ্যসভায় যাচ্ছেন, তখন তা মৌলিকভাবে ভুল… এটি ক্ষমতা বিভাজনের নীতির পরিপন্থী।
সৌজন্যে : দ্য ওয়ার (thewire.in)


