শোয়েব দানিয়াল

২০২১ সালে, সুইডেন-ভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে প্রথমবারের মতো ভারতকে গণতন্ত্র হিসেবে নয়, বরং একটি নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভি-ডেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র হলো এমন একটি দেশ যেখানে বহুদলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা বিদ্যমান – কিন্তু তা ত্রুটিপূর্ণ। এছাড়াও বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ আরোপ করে রাষ্ট্র।
উল্লেখ্য, ভি-ডেমের মতে, যদিও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে, তাদের তথ্য অনুযায়ী মোদীর ভারতকে নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের এই উদারনৈতিক দিকগুলোর অবক্ষয়ই ‘সবচেয়ে বেশি’ প্রভাব ফেলেছে। পাঁচ বছর পর যখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তখন এটা স্পষ্ট যে মোদীর ভারত এখন এই দুটি উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করেছে: নির্বাচন পরিচালনাও একটি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খেয়েছে।

অযৌক্তিক অসঙ্গতি
নির্বাচনের ঠিক আগে, ভারতের নির্বাচন কমিশন রাজ্যে একটি বিশেষ নিবিড় সংশোধন চালিয়েছে। প্রত্যেক ভোটারের অস্তিত্ব যাচাই করার প্রয়াসে, এই প্রক্রিয়াটি ছিল ব্যাপক এবং স্বাধীন ভারতে আগে কখনও দেখা যায়নি এমন পরিসরে পরিচালিত হয়। এটি শুরু হওয়ার আগেই সন্দেহ দেখা দিয়েছিল যে, নির্বাচনের ঠিক আগে কেন এত বড় একটি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এই আশঙ্কাটি এমন এক প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় যে, একটি নতুন আইন কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশন মোদী সরকারের হাতের পুতুল হয়ে পড়েছে।
এইসব সন্দেহ সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বটি বেশ শক্তিশালী একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। কারা মারা গেছেন, অন্যত্র চলে গেছেন বা অন্য রাজ্যে ভোটার আইডি কার্ড রেখেছেন, তা খুঁজে বের করার জন্য নির্বাচন কমিশন ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে ভোটারদের মিলিয়ে দেখে।
একমাত্র সমস্যা ছিল: এই বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতির ফলে এমন বিপুল সংখ্যক মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান, যারা সাধারণত ভারতীয় জনতা পার্টিকে ভোট দিতেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে মিল রেখে ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার ফলে অনেক বাংলাদেশী হিন্দু অভিবাসী এবং উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে আসা অভিবাসীরা বাদ পড়ে যান।
এর পরে, নির্বাচন কমিশন একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করে। তারা বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি পরীক্ষা’ (logical discrepancies test) চালু করে – যা এর আগে অন্য কোনও রাজ্যে ব্যবহৃত হয়নি। পরিহাসের বিষয় হলো, এই পরীক্ষাটির মধ্যে যৌক্তিকতার লেশমাত্রও ছিল না। বাবা-মায়ের নামের বানানে ভুল, বাবা-মায়ের সাথে বয়সের ব্যবধান খুব কম বা বেশি বলে বিবেচিত হওয়া, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সাথে বয়সের ব্যবধান যথেষ্ট না থাকা অথবা ছয়টির বেশি সন্তান থাকা – এই সবকিছুকেই নির্বাচন কমিশন তথাকথিত যৌক্তিক অসঙ্গতি হিসেবে গণ্য করে। নির্দিষ্ট সংখ্যক সন্তান থাকা বা নথিপত্রে বানান ভুলের কারণে কেন একজন ভোট দেওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তার পেছনের যুক্তি কমিশন কখনওই ব্যাখ্যা করেনি।
আরও খারাপ ব্যাপার হলো, এই যৌক্তিক অসঙ্গতি পরীক্ষাটি একটি অস্বচ্ছ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রয়োগ করা হয়, যার কার্যপ্রণালী ভারতীয় জনগণের কাছে উন্মুক্ত ছিল না।

অ-বিজেপি ভোটারদের বাদ দেওয়া
নির্বাচন কমিশনের এই নতুন ছাঁকনির ফলাফল ছিল উল্লেখযোগ্য: এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ফলে এখন প্রায় ত্রিশ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন, যাদের অধিকাংশই মুসলিম। এখন পর্যন্ত উপস্থাপিত সমস্ত প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে, এই বাদ দেওয়ার পেছনে সামান্যই যুক্তি ছিল এবং মনে হচ্ছে তা শুধুমাত্র একটি মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। আর তা হলো ধর্ম। একটি ক্ষেত্রে, একটি ট্রাইব্যুনাল কংগ্রেস প্রার্থী মোতাব শেখকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয় এবং আশ্চর্যজনকভাবে উল্লেখ করে যে, তাকে কেন প্রথমে বাদ দেওয়া হয়েছিল তার কোনও কারণ নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। যেহেতু এই অন্যায়ভাবে বাদ পড়া প্রায় সকল ভোটারই মুসলিম, যারা সাধারণত বিজেপিকে ভোট দেন না, তাই হিন্দুত্ববাদী দলটি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া একটি অন্যায্য কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সুবিধা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে।
ভি-ডেম যেমন উল্লেখ করেছে, ভারতের গণতান্ত্রিক পতনের অনেকটাই এই ধারণার উপর ভিত্তি করে হয়েছিল যে এর উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে, আদালতগুলো সরকারকে জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমেরও তীব্র পতন ঘটেছে। বছরের পর বছর ধরে, মূলধারার টিভি নিউজ চ্যানেল এবং এমনকি সংবাদপত্রগুলোও সরকারের প্রশংসা করে আসছে এবং সমস্ত সমালোচনা ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দলের জন্য তুলে রাখছে।

নির্বাচনকে পাশ কাটানো
এখন বিজেপি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে যে, ২০২৪-এর নির্বাচনের মতো তীব্র তিরস্কারের ঘটনা যেন আর না ঘটে। (এই নির্বাচনে একক গরিষ্ঠতা হারায় বিজেপি। উল্লেখ আমাদের।) বাংলার এই বিশেষ ব্যাপক সংশোধন সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই একটি বড় পদক্ষেপ। মোদী সরকার-নিযুক্ত নির্বাচন কমিশন যদি কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই লক্ষ লক্ষ বিরোধী দলের ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে ভারতে নির্বাচনের অর্থ কী দাঁড়াবে?

বাংলার ফলাফল বহুলাংশে ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণ করবে। যদি বিজেপি এই রাজ্যে জয়ী হয়, তবে অন্যান্য রাজ্যে এবং অবশেষে ২০২৯ সালের সংসদীয় নির্বাচনেও এই গণহারে ভোটার বাদ দেওয়ার চেষ্টা থেকে তাদের আটকানোর মতো তেমন কিছু থাকবে না।
ঔপনিবেশিক আমলের ভারতীয় রাজনীতিবিদ গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ঘোষণা করেছিলেন বলে মনে করা হয়, ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে।’ এই উক্তিটি ব্রিটিশ ভারতের অধীনে বাংলার অগ্রগতির প্রশংসা করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
যদি নির্বাচন কমিশনের এই গণহারে ভোটার বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে সফল হয়, তবে উক্তিটি হয়তো তখনও টিকে থাকবে – কিন্তু তার অর্থ অনেক বেশি অন্ধকারের হবে।

লিখেছেন শোয়েব দানিয়াল
স্ক্রোল.ইন এ ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ লেখাটি প্রকাশিত হয়।
ভাষান্তর ও ছবি আমাদের।
সৌজন্যে : scroll.in

45 Views