আশিস কুমার ঘোষ, কলকাতা
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মানুষের জীবনে ঘন ঘন হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ এক কঠিন বাস্তবতা। তাঁদের জন্য আশার নতুন দিশা নিয়ে মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুর শাখা বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করল একটি বিশেষ ‘থ্যালাসেমিয়া প্রিভিলেজ ক্লিনিক’ এবং ‘ডে কেয়ার ওয়ার্ড’। এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন ক্লিনিক্যাল হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ড. রাজীব দে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এইচওডিও সিনিয়র কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিক্স, ড. সৌমেন মেউর, পেডিয়াট্রিশিয়ান ও নিওনেটোলজিস্ট ড. অতনু কুমার জানা, হসপিটাল ডিরেক্টর জয়ন্তী চ্যাটার্জী প্রমুখ। এই উদ্যোগ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য আরও উন্নত, সমন্বিত ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে এদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন এই ক্লিনিকটি এক ছাদের নিচে থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত সমস্ত পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। মূলত ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু ও কিশোর রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা এখানে দেওয়া হবে। এই পরিষেবার মধ্যে রয়েছে থ্যালাসেমিয়া ও ক্যারিয়ার শনাক্তকরণের ডায়াগনস্টিক পরিষেবা, ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন, বিশেষ ডে কেয়ার ওয়ার্ডের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালন সহায়তা, প্রি-নাটাল ডায়াগনোসিস, জেনেটিক কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা, মাল্টিডিসিপ্লিনারি কেয়ার এবং বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের সুবিধা। এর ফলে রোগীরা পাবেন সম্পূর্ণ সমন্বিত চিকিৎসা পরিষেবা। প্রফেসর (ড.) রাজীব দে সপ্তাহে একদিন এই ক্লিনিকে রোগী দেখবেন, যাতে রোগীরা নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পান। পাশাপাশি রোগীদের দেওয়া হবে একটি ‘থ্যালাসেমিয়া প্রিভিলেজ কার্ড’, যার মাধ্যমে তাঁরা সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
এই প্রসঙ্গে প্রফেসর (ড.) রাজীব দে বলেন, ‘ভারতে থ্যালাসেমিয়া এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশে প্রায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ শিশু থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ভারতে প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মের মধ্যে প্রায় ১.২ জন থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এখানে ১০ শতাংশেরও বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং ২০,০০০-এরও বেশি রোগীর নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে আজীবন রক্ত সঞ্চালন ও আয়রন কিলেশনই মূল চিকিৎসা পদ্ধতি। থ্যালাসেমিয়ার নিরাময়ের একমাত্র উপায় হল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। উল্লেখযোগ্যভাবে, মুকুন্দপুর ক্লাস্টারে একটি বিশেষ বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিটও রয়েছে, যা রোগীদের উন্নত চিকিৎসা পেতে সহায়তা করবে।’
এদিন রিজিওনাল ডিরেক্টর – মণিপাল হসপিটালস ইস্ট ড. অয়নাভ দেবগুপ্ত বলেন, ‘পূর্ব ভারতে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ যথেষ্ট বেশি। পশ্চিমবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার ৮–১০ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৩–৪ শতাংশ। মণিপাল হসপিটালসের এই থ্যালাসেমিয়া প্রিভিলেজ ক্লিনিক আমাদের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন, যেখানে আমরা সাশ্রয়ী ও সমন্বিত চিকিৎসা পরিষেবা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যারিয়ার শনাক্তকরণ ও জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করা থেকে শুরু করে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের মতো উন্নত চিকিৎসা প্রদান—আমাদের লক্ষ্য ধীরে ধীরে একটি থ্যালাসেমিয়া-মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা।’ এই উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হসপিটালস আরও একবার প্রমাণ করল যে তারা সহজলভ্য, সমন্বিত ও বিশেষ স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দক্ষ চিকিৎসক দল, আধুনিক পরিকাঠামো এবং রোগীকেন্দ্রিক পরিষেবার মাধ্যমে হাসপাতালটি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের উন্নত চিকিৎসা ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

