আশিস কুমার ঘোষ, কলকাতা

সারা বিশ্বে মেরুদণ্ডজনিত সমস্যা বর্তমানে অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এই ধরনের রোগ অনেক সময় নিঃশব্দে মানুষের চলাফেরা, স্বনির্ভরতা এবং জীবনযাত্রার মান কেড়ে নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রায় ৬১.৯ কোটি মানুষ কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৮৪ কোটিরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে বসা, স্থূলতা এবং বয়স বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই মেরুদণ্ডের সমস্যা বাড়ছে। তাই এমন আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, যা শুধুমাত্র রোগ সারায় না, মানুষের স্বাভাবিক জীবনও ফিরিয়ে দেয়।
মেরুদণ্ডের চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরে মঙ্গলবার আয়োজিত হয় ‘প্রিসিশন অ্যাট দ্য কোর’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্লিনিক্যাল লিড ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, স্পাইন সার্জারি ডাঃ অনিন্দ্য বসু, অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, স্পাইন সার্জারি ডাঃ প্রত্যুষ শাহি, এবং স্পেশালিস্ট সার্জন, ডাঃ সৌরভ ঘোষ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠা ১০ জন রোগী।

এই অনুষ্ঠানে দেখানো হয় কীভাবে আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি জটিল মেরুদণ্ডের সমস্যার চিকিৎসাকে আরও নিরাপদ, নিখুঁত এবং কম কষ্টদায়ক করে তুলছে।
চিকিৎসকরা জানান, মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরের স্পাইন সার্জারি বিভাগে অত্যাধুনিক ইমেজিং ও নেভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে অস্ত্রোপচারের সময় মেরুদণ্ডের ত্রিমাত্রিক ছবি তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়, ফলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয় এবং জটিলতার ঝুঁকিও কমে। বিশেষ করে মেরুদণ্ডের বিকৃতি সংশোধন, পুরনো অস্ত্রোপচারের পুনরায় চিকিৎসা, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত এবং জটিল মেরুদণ্ড পুনর্গঠন অস্ত্রোপচারে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর।
হাসপাতালটি বর্তমানে এন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারির ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এটি মেরুদণ্ডের অত্যন্ত আধুনিক ও কম কাটা-ছেঁড়ার অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে খুব ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে স্লিপ ডিস্ক, স্পাইনাল স্টেনোসিস এবং স্নায়ুর ওপর চাপজনিত সমস্যার চিকিৎসা করা হয়। ফলে রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা কম হয়, হাসপাতালে কম দিন থাকতে হয় এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব হয়।
মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরের স্পাইন প্রোগ্রামের অন্যতম বড় শক্তি হলো স্কোলিওসিস এবং জটিল মেরুদণ্ড বিকৃতি সংশোধন অস্ত্রোপচারে বিশেষ দক্ষতা। আধুনিক অস্ত্রোপচার পরিকল্পনা, উন্নত স্নায়ু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, থ্রি-ডি নেভিগেশন এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক— উভয় ধরনের রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে পূর্ব ভারত এবং প্রতিবেশী দেশগুলির বহু রোগী স্কোলিওসিস, কাইফোসিস এবং জটিল মেরুদণ্ড বিকৃতির চিকিৎসার জন্য এখানে আসছেন।
অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি হাসপাতালটি সম্পূর্ণ মেরুদণ্ড পরিচর্যার সুবিধাও প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন, ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা, কম কাটা-ছেঁড়ার অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা, মেরুদণ্ডের বিকৃতি সংশোধন, টিউমারের চিকিৎসা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত পুনর্গঠন অস্ত্রোপচার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জন, ব্যথা বিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।

মেরুদণ্ড চিকিৎসার আধুনিক অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডাঃ অনিন্দ্য বসু বলেন, ‘গত এক দশকে মেরুদণ্ড অস্ত্রোপচারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ও-আর্ম নেভিগেশন এবং এন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারির মতো প্রযুক্তির সাহায্যে এখন আরও জটিল অস্ত্রোপচার অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি রোগীকে তাঁর সমস্যার উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা।’ এদিন
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক রোগী, নরেন্দ্রপুরের ৬৭ বছর বয়সী অশোক কুমার কর্মকার বলেন, ‘প্রায় ৫–৬ মাস ধরে আমি অসহ্য পায়ের ব্যথায় ভুগছিলাম। হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। পরে ডাঃ অনিন্দ্য বসুর সঙ্গে দেখা করলে জানা যায় আমার এল ৩–এল ৪ ডিস্ক সরে গিয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। ৪ মে হাসপাতালে ভর্তি হই এবং ৫ মে অস্ত্রোপচার হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, আমি বুঝতেই পারিনি কখন অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। চোখ খুলে যখন জানলাম সব শেষ, তখন এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করেছিলাম। এখন আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছি, পরিবারের জন্য চা পর্যন্ত বানাতে পারছি। মনে হচ্ছে আমি যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।’
তাঁর স্ত্রী বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর যখন উনি জিজ্ঞাসা করলেন কবে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হবে, তখনই বুঝেছিলাম পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ ও ব্যথাহীন ছিল। এতদিনের দুশ্চিন্তার পর ওঁকে আবার দাঁড়াতে দেখে আমরা ভীষণ স্বস্তি পেয়েছি।’ অপর এক রোগী, হুগলির হরিপালের ৩০ বছর বয়সী প্রতীক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে পিঠ ও পায়ের অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছিলাম। মেয়েকে কোলে নেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরে এমআরআই রিপোর্টে এল ২–এল ৪ অংশে ডিস্কের সমস্যা ধরা পড়ে। ডাঃ অনিন্দ্য বসুর পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করি। এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি। সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো, কয়েক মাস পর আবার মেয়েকে কোলে নিতে পারব— এই আশাই আমাকে প্রতিদিন সাহস দেয়।’
আরও এক রোগী, মেঘালয় সরকারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও হালতুর বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী তপন কুমার দে বলেন, ‘পায়ের ব্যথা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ঘুম পর্যন্ত হত না। মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছি। পরে মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরে অস্ত্রোপচার হয়। সেদিন সন্ধ্যাতেই আমাকে হাঁটানো হয় এবং পরের দিন থেকেই হাসপাতালের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছিলাম। এখন আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি।’
এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের একত্রিত করে দেখানো হয়েছে যে আধুনিক কম কাটা-ছেঁড়ার এবং এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ড অস্ত্রোপচার শুধু চিকিৎসার ফলাফলই উন্নত করছে না, বরং মানুষের জীবন, চলাফেরা এবং নতুন আশাও ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই উদ্যোগ মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরের উন্নত প্রযুক্তি, চিকিৎসাগত দক্ষতা এবং মানবিক পরিষেবার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিকেই আরও একবার তুলে ধরেছে।

5 Views