আশিস কুমার ঘোষ, মুকুন্দপুর

একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সাফল্য পেল নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতাল। সফলভাবে ৩০ জনেরও বেশি স্থূলকায় রোগীর রোবোটিক রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করল এই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দল। পূর্ব ভারতে এই ধরনের সর্বাধিক সংখ্যক সফল প্রতিস্থাপন হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়েছে। এই সাফল্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) রোগীদের চিকিৎসায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য, হাসপাতালের ওই বিশেষজ্ঞ দলটি ৫১ বছর বয়সী এক রোগীর ওপেন কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছে শুধুমাত্র রিজিওনাল (স্পাইনাল ও এপিডিউরাল) অ্যানাস্থেশিয়ার মাধ্যমে। রোগীটি জেনারেল অ্যানাস্থেশিয়ার উপযুক্ত ছিলেন না। ফলে পুরো অস্ত্রোপচারের সময় তিনি সচেতন অবস্থাতেই ছিলেন। জটিল পরিস্থিতিতেও কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মোচিত করেছে এই সাফল্য।
ভারতে বর্তমানে স্থূলতা ও ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। এটা সিকেডি (CKD) -র অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ নতুন সিকেডি রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই শেষ পর্যন্ত কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। তবে স্থূলতা থাকলে প্রচলিত ওপেন সার্জারিতে জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। ফলে অনেক সময় রোগীরা প্রতিস্থাপনের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েন।
ডা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম ব্যবহার করে রোবোটিক প্রতিস্থাপন এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। স্থূলতা বা একাধিক রোগে আক্রান্ত যেসব রোগী আগে উচ্চ-ঝুঁকির কারণে প্রতিস্থাপনের সুযোগ পেতেন না, তারাও এখন কম সংক্রমণ, ছোট চেরা এবং দ্রুত সুস্থতার সুবিধা নিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে পারছেন। বেশিরভাগ রোগী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হাঁটাচলা শুরু করতে পারছেন এবং হাসপাতালেও কম দিন থাকতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার ফল আরও উন্নত হচ্ছে।
তবে স্থূলকায় রোগীদের রোবোটিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। এতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাসকুলার অ্যানাস্টোমোসিস করতে হয় এবং দীর্ঘ অপারেশন সময়ের কারণে অস্থায়ী কিডনি সমস্যার ঝুঁকি থাকে। হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দল শুরু থেকেই অপারেশনের সময় কমিয়ে এনে সফল ফল নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এ বিষয়ে কনসালট্যান্ট – জেনারেল সার্জারি, রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট ও রোবোটিক সার্জারি ডা. তারশিদ আলি জাহাঙ্গীর বলেন, ‘প্রচলিত কিডনি প্রতিস্থাপনে স্থূলতা জটিলতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। রোবোটিক সার্জারি সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমায়। যদিও এর নিজস্ব কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ভাসকুলার সংযোগের সময় কমানো। আমাদের দল শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ইতিবাচক ফল নিশ্চিত করতে পেরেছে।’
অন্যদিকে, কনসালট্যান্ট – ইউরোলজি ও রোবোটিক সার্জারি ডা. সত্যদীপ মুখার্জি বলেন, ‘এই ধরনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের সমন্বিত প্রচেষ্টা। রোবোটিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট, বিশেষত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ও স্থূলকায় রোগীদের ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র সার্জিক্যাল দক্ষতা নয়, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের টিমের শক্তিই হল এই সহযোগিতা।’ সবচেয়ে জটিল কেসগুলির একটিতে, গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগা এক ৫১ বছর বয়সী রোগীর ওপেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুধুমাত্র রিজিওনাল অ্যানাস্থেশিয়ায় সম্পন্ন করা হয়। জেনারেল অ্যানাস্থেশিয়ার অনুমোদন না পাওয়ায় রোগী পুরো অস্ত্রোপচারের সময় সচেতন ছিলেন। পেট সম্পূর্ণ শিথিল না হওয়া এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকায় অ্যানাস্টোমোসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবুও সফলভাবে প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থতার লক্ষণ দেখান।
অভিজিৎ সি. পি., ডিরেক্টর ও ক্লাস্টার হেড – কলকাতা এবং কর্পোরেট গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ, নারায়ণা হেলথ (ইস্ট) বলেন, ‘এই সাফল্য দেখিয়ে দেয় কীভাবে চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নতি বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান করতে পারে, বিশেষ করে স্থূলতা-জনিত কিডনি রোগের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে এটি উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য শক্তিশালী মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম গঠনের গুরুত্বও তুলে ধরে।’ পাশাপাশি আর. ভেঙ্কটেশ, গ্রুপ চিফ অপারেটিং অফিসার (COO), নারায়ণা হেলথ বলেন, ‘রোবোটিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং যেসব রোগীর চিকিৎসার বিকল্প সীমিত, তাদের জন্য নিরাপদ অস্ত্রোপচারের সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ধরনের অগ্রগতি জটিল কেসে চিকিৎসার ফল আরও উন্নত করতে সাহায্য করছে।’
ট্রান্সপ্ল্যান্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের প্রযুক্তিগত সাফল্য ভবিষ্যতে স্থূলকায় ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী কিডনি প্রতিস্থাপনকে আরও নিরাপদ ও সহজলভ্য করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

16 Views