ওয়েব ডেস্ক : এ এক ভিন্ন চিত্র! বাংলার রাজধানী কলকাতা শহরে বা রাজ্যের অন্যান্য শহরে বইয়ের স্টলে হামলার ঘটনা এবং এর প্রতিবাদে যখন ‘বইয়ের জন্য হাঁটছে’ মানুষ, তখন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসছে বক্সা জঙ্গলের গভীরে সাতটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলা আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটি গ্রাম পানিঝোরার বইয়ের গ্রামে পরিণত হওয়ার খবর। জেন জি প্রজন্মের বাসিন্দাদের উদ্যোগে ৭০টি পরিবার ও ৩২০ জন মানুষের বসতি পানিঝোরা এখন ‘বইয়ের গ্রাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এর শিক্ষিত তরুণ বাসিন্দাদের উৎসাহ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন প্রাণ এনেছে৷ ওই বিদ্যালয়ে এখন ৪০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করে। গ্রামটি এখন কিছু পর্যটকদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠেছে।

পানিঝোরা জুড়ে বিভিন্ন বাড়িতে ছোট ছোট বইয়ের তাক করা হয়েছে। ওইসব তাকের প্রতিটিতে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ২৫ থেকে ৩০টি বই রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা সেসব বই পড়ে। যদিও বইগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। পাঠকরা একটি বই ধার নেয়, পড়া শেষে ফেরত দিয়ে আরেকটি নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত ২৫টি পরিবার এই ঘরোয়া গ্রন্থাগার স্থাপন করেছে। ওইসব পরিবারের প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় একটি করে বইয়ের বাক্স রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির নামে একটি করে বই রাখা হয়েছে। কোনওটির নাম প্রথম আলো, অন্যগুলোর নাম সঞ্চয়িতা বা মেঘমল্লার। কিন্তু এই গ্রামের মানুষ এখন চিন্তিত বলে খবর। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বইয়ের স্টল ভাঙচুর ও বই নষ্ট করার খবর এখানকার বাসিন্দারাও টেলিভিশনে শুনেছেন।

পানিঝোরা গ্রামে ঢোকার মুখে আশিস মিঞ্জের ছোট্ট দোকান। নিজের দোকানে বসে তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পেরেছি বই কতটা শক্তিশালী। প্রতিটি অক্ষর তৈরি হয় অপরিসীম পরিশ্রমে। আমার মতে, বইয়ের ওপর হামলা করা একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।’
প্রসঙ্গত, এই গ্রামে বসবাস করে সাতটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। ওরাওঁ, মুন্ডা, খারিয়া, রাভা, গারো, নেপালি, মেচ, দুকপা, বাঙালি এবং বিহারী সম্প্রদায়। ভাষা, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও, গ্রামের তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগে তারা গ্রামটিকে পুনর্গঠনের জন্য একত্রিত হয়েছে। এই প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট। নিকটবর্তী দমনপুর হাইস্কুলের শিক্ষক পার্থ সাহা বলেন, প্রথম পদক্ষেপ ছিল গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো যাতে তাদের প্রাপ্য পায় তা নিশ্চিত করা। দ্য ওয়ারকে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা এই দরিদ্র পরিবারগুলো যাতে বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কাছে যাই। একই সাথে, আমরা গ্রামের প্রতিটি শিশুর জন্য স্কুলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করি।’ তিনি আরও বলেন, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যা আমাদের আশা জোগায় তা হলো, গ্রামের তরুণ প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা এখন দায়িত্ব নিয়েছে। পানিঝোরার এই পরিবর্তনে অনুপ্রাণিত হয়ে, পার্শ্ববর্তী দশটি গ্রামও একই ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বই।

জঙ্গলের জীবন এখনও কঠিন। পানিঝোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রঞ্জিত বর্মন বলেন, দারিদ্র্য দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে রেখেছে। তিনি ‘দ্য ওয়্যার’কে বলেন, ‘বনের গ্রামগুলো নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। আগে এখানকার গরিব পরিবারগুলো জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে জীবনধারণ করত। আয় কম বা একেবারেই না থাকায় তাদের পক্ষে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে আসা কঠিন ছিল। সমস্যাগুলো দূর হয়ে যায়নি। পরিবারগুলোকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও হাতিরা তাদের পুরো ধানের ফসল খেয়ে ফেলে। এখন জঙ্গলে প্রবেশও নিষিদ্ধ। এই পরিবারগুলোর জন্য জীবিকা নির্বাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তারা দেখতে পাচ্ছে যে, তরুণ প্রজন্মের প্রচেষ্টা তাদের জীবন বদলে দিচ্ছে।’

মাশরুম, গোলমরিচ এবং কমলালেবু-সহ নতুন ফসলের প্রচলন করা হয়েছে এবং একটি এনজিও গ্রামবাসীদের জৈব সার ব্যবহার করে বিকল্প চাষাবাদে সাহায্য করছে। বাসিন্দারা বলছেন, এই প্রচেষ্টাগুলো কিছুটা আশা জাগিয়েছে। এখন স্কুলছুটের হার কম। কাছের একটি স্কুলের শিক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এর ফল শ্রেণিকক্ষেই দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার দিক থেকে গ্রামটি রেকর্ড গড়েছে। গ্রামে এখন আর কেউ স্কুল ছেড়ে দেয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পানিঝোরার নিজস্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চালু আছে, অন্যদিকে ছয় কিলোমিটার দূরে দমনপুরের উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ায় নতুন জীবন পেয়েছে।’ গ্রামের তরুণ-তরুণীরা একটি স্বেচ্ছাসেবী দলও গঠন করেছে। এর সদস্যরা বয়স্ক বাসিন্দাদের নাম সই করতে শেখায় এবং বিপদে পড়া পরিবারগুলোকে সাহায্য করার জন্য একত্রিত হয়। স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সমীর টোপ্পো একজন কলেজ ছাত্র। তিনি ‘দ্য ওয়্যার’কে বলেন, ‘আমরা আমাদের গ্রামে সাতটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে একত্রিত করেছি। এখন সবাই বাংলা শিখেছে।’ ‘আগে মানুষ মূলত নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলত।’ ‘গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টান। তবুও তাদের ধর্মীয়, জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বেশ আলাদা। আমরা এই বাধাগুলো অতিক্রম করেছি।’ ‘আমরা মেয়েদের একটি লোকসংগীত ও নৃত্যের দল গঠন করেছি এবং একটি ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের গ্রামে কেউ নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে না। আমরা নিজেদের নিয়মও তৈরি করেছি। কেউ প্লাস্টিক ব্যবহার করে না এবং যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলে না।’

‘আমাদের আরও অনেক বই প্রয়োজন।’ প্রতিটি বাড়ির গ্রন্থাগারের নিজস্ব বিষয়বস্তু রয়েছে। প্রমিলা টোপ্পোর বাড়িতে বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজির বই আছে। কৃতা কেরকেট্টার বাড়িতে গল্পের বই, আর দীপিকা ওরাওঁর সংগ্রহে রয়েছে বাংলা কথাসাহিত্য। স্কুলের পাশে একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারও স্থাপন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের কথা শুনে কয়েকজন বইয়ের তাক এবং পুরনো বই দান করেছেন। কিন্তু গ্রামের বই আরও প্রয়োজন। ‘আমরা প্রত্যেকের বাড়িকে গ্রন্থাগারে পরিণত করেছি…’। আমরা সময়ে সময়ে স্পোকেন ইংলিশ এবং সাধারণ জ্ঞানের ক্লাসেরও আয়োজন করতে পেরেছি। অনেক শিক্ষক আমাদের সাহায্য করতে এখানে আসেন। বই পড়া আমাদের একটি সম্প্রদায় হিসেবে একসঙ্গে বসবাসের আনন্দ বুঝতে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন আমাদের আরও অনেক বই দরকার! এই ধারণাটি এখন ছড়িয়ে পড়ছে। কালকূট, গরমবস্তি, মাঝেরডাবড়ি এবং তামারচি-সহ দশটি গ্রাম একই ধরনের উদ্যোগ শুরু করার জন্য বই খোঁজা শুরু করেছে। যখন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা হচ্ছে এবং বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি নষ্ট করা হচ্ছে, তখন পানিঝোরার বাসিন্দারা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, অর্থাৎ তাদের বইগুলোকে রক্ষা করছেন।

সূত্র : ৩১ আগস্ট, ২০২৬ দ্য ওয়ার ডট ইন। জয়দীপ সরকারের প্রতিবেদন। (thewire.in)

99 Views