ওয়েব ডেস্ক : নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ওড়িশার তিলোত্তমা মাঝি। ওড়িশার জগৎসিংহপুর জেলার নুনুকুয়া গ্রামের যে নারীরা ভাবতেন, তাঁদের জগৎ কেবল কৃষিকাজ আর গৃহস্থালির কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাঁদের স্বাধীনভাবে উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন এক সাধারণ নারী তিলোত্তমা মাঝি। সাধারণ হয়েও এক অসাধারণ কাজ করছেন তিনি। তাঁর তত্ত্বাবধানে গ্রামের নারীরা নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছেন — দুটি চালকল পরিচালনা করছেন, ফিঙ্গার মিলেটের লাড্ডু তৈরি করছেন, সেগুলোর ওজন ও প্যাকিং করছেন এবং আশেপাশের ২০টিরও বেশি দোকানে নিজেদের পণ্য সরবরাহ করছেন। শুধু লাড্ডু বিক্রিই মাসে প্রায় ৪০,০০০ পিস হয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা। উল্লেখ্য, তিলোত্তমা মাঝি নিজেকে একজন কৃষক হিসেবে পরিচয় দেন। ২০১২ সালে ১২ জন মহিলাকে নিয়ে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী শুরু করেন তিনি। বর্তমানে, এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসাগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৮০ জন মহিলা উপার্জন করেন। তিলোত্তমার উদ্যোগে গড়ে ওঠা মা তারা তারিণী স্বনির্ভর গোষ্ঠীটি শুরু হয় ধান চাষ ও মাছ ধরার মাধ্যমে। এই কাজগুলো গ্রামের মহিলারা আগে থেকেই জানতেন। শুরুতে পুঁজি কম থাকায়, তাই তাঁদের যা আছে তা দিয়েই আরও বেশি উপার্জনের একটি উপায় খুঁজে বের করেন তিনি। কারণ, ধান থেকে চাল তৈরি করার সুযোগ, মাছ শুকিয়ে বিক্রি করার সুযোগ এবং স্থানীয়ভাবে ‘মান্ডিয়া’ নামে পরিচিত ফিঙ্গার মিলেট দিয়ে জলখাবার তৈরি করে তা স্থানীয় দোকানগুলোতে রেখে বিক্রির সুযোগকে ব্যবহার করেন।

২০২৩ সালে আইসিএআর-সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেন ইন এগ্রিকালচার (আইসিএআর-সিআইডব্লিউএ) একটি তিন দিনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই দলটিকে বাজরা প্রক্রিয়াজাতকরণে হাতেখড়ি দেয়। মহিলারা লাড্ডু, কুকিজ এবং নোনতা খাবার তৈরি করতে শুরু করেন। তাদের পণ্যের তালিকায় এখন শুঁটকি মাছ, মশলা এবং বড়ি (কালো ছোলা থেকে তৈরি শুকনো ছোট টুকরো) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দলটি বছরে প্রায় ১০ কুইন্টাল বড়ি বিক্রি করে। এখন এই গোষ্ঠীর মহিলারা উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত সমস্ত কাজ নিজেরাই সামলান। তাঁরা নিজেরাই পণ্য ওজন করেন ও মোড়কজাত করেন, সেগুলো মেলা ও স্থানীয় বাজারে নিয়ে যান এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি করেন। চালকলের পাশাপাশি তাঁরা মশলা বাটা, বড়ি তৈরি এবং পণ্য মোড়কজাত করার সরঞ্জামও চালান। যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামত করতেও তাঁরা শিখেছেন। সিআইডব্লিউএ-এর সহায়তায় দলটি একটি কাস্টম হায়ারিং সেন্টারে প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যেখানে কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়ায় পাওয়া যায়।

মহিলারা বাজরা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রসারিত করতে এবং আরও বেশি প্যাকেটজাত পণ্য বিক্রি করার জন্য ৩০ সদস্যের ‘মাতৃশক্তি মিলেট প্রোডিউসার গ্রুপ’ গঠন করেছেন। এর সদস্যরা পণ্যে লেবেল লাগানো এবং বিক্রির জন্য প্রস্তুত করার কাজ করেন। মাঝির অনুমান, এই উৎপাদক গোষ্ঠীটি শেষ পর্যন্ত বছরে ২০-৩০ লক্ষ টাকার ব্যবসা করতে পারবে। অন্যদিকে, ‘মা তারা তারিণী স্বনির্ভর গোষ্ঠী’ ২০২৫-২৬ সালে ১২-১৫ লক্ষ টাকা আয় করেছে বলে জানা গেছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের পাশাপাশি অন্যান্য কাজও বেড়েছে। কিছু মহিলা স্কুলের ইউনিফর্ম সেলাই করেন এবং অঙ্গনওয়াড়ির শিশুদের জন্য পোশাক সরবরাহ করেন। তিলোত্তমা ধান চাষ ও বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দুই একরের একটি পুকুরে মাছ চাষ করেন। মাছ চাষে তাঁর কাজও বিভিন্ন মহল থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে।

মা তারা তারিণী গোষ্ঠীর সদস্য নিরুপমা মহারথ একেবারে শুরুর দিনগুলো থেকে তিলোত্তমা মাঝিকে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে দেখেছেন। তিনি বলেন,
‘আমি তিলোত্তমাকে শুরু থেকেই দেখছি। আজ তিনি যে অবস্থানে আছেন, সেখানে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমরা সবাই তাঁর জন্য গর্বিত। তাঁর সাফল্য আমাদের উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস জোগায়।’ তিলোত্তমার মতে, এই নেটওয়ার্কের নারীদের প্রত্যেকের মাসিক আয় প্রায় ১০,০০০ টাকা। মহারথ তাঁর মতো নারীদের জন্য এই কাজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে একটি কম অঙ্কের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘উনি যদি তাঁর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে পারেন, আমরাও আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাসে ৫,০০০ টাকা উপার্জন করে পরিবারকে সাহায্য করতে পারি।’ তিলোত্তমা বলেন, নিজের ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে তিনি ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ, মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়া এবং যৌথ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন। অন্য মহিলাদের ক্ষেত্রেও এই আয় স্কুলের খরচ এবং সংসারের বিল মেটাতে ব্যয় হয়। যখন এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাত্র ১২ জন সদস্য ছিলেন, তখন থেকে মহারথ কাছ থেকে দেখেছেন তিলোত্তমাকে।

সুত্র : ইটিভি ভারত (ETV Bharat)

79 Views