ওয়েব ডেস্ক : ন্যায্য পাওনা আদায়ে লাগাতার আন্দোলন করছেন লংভিউ চা বাগানের শ্রমিকেরা।
প্রসঙ্গত, দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং মহকুমায় অবস্থিত লংভিউ চা বাগান (Longview Tea Estate) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ পরিকল্পনাবিদ সিজি অ্যাডামস। প্রায় ৫০৬ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই বাগানটি দার্জিলিংয়ের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদক। ২০২৫ সালে একটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে বাগানের প্রায় ১২০ হেক্টর (মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ২৪%) জমির চা গাছ পুড়ে যায়।এর ফলে বিশাল ক্ষতি হয়। বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও মজুরি নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বাগানটি অতীতে বেশ কয়েকবার বন্ধ ও পুনরায় চালু হয়েছে। এখন এই বাগানের শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি অবিলম্বে মেটানো-সহ অন্যান্য দাবির ভিত্তিতে রিলে অনশনে বসেছেন। এখানে কাজ করেন প্রায় ১২০০ শ্রমিক-কর্মচারী। অভিযোগ, গত ১২ বছর ধরে শ্রমিকরা আর্থিক বঞ্চনার শিকার। প্রথমত, ২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পিএফের টাকা সরকারি তহবিলে জমা পড়েনি। যার পরিমাণ অন্তত ১৪ কোটি টাকা। এই টাকা শ্রমিক কর্মচারীদের মজুরি থেকেই কাটা হয়। ৮৪ লক্ষ গ্রাচুইটির টাকা অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক কর্মচারীদের মেটানো হয়নি। ২০১৭ থেকে ৭৬ জন অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক গ্রাচুইটি পাননি। কেউ কেউ গ্রাচুইটি না পেয়েই মারা গেছেন। অভিযোগের তির বাগানের অন্যতম কর্তৃপক্ষ ডিরেক্টরের দিকে। যার নামে প্রভিডেন্ট ফান্ড নয়ছয় করার মামলাও রয়েছে। বেরিয়েছে গ্রেফতারী পরোয়ানা। শ্রমিকদের জমির পাট্টা না দিয়ে বাগানের জমি বড় কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

গত ৩ বছর ধরে হিল প্ল্যানটেশন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের নেতৃত্বে লং ভিউ চা বাগানের শ্রমিক কর্মচারীরা বকেয়া পাওনার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। গত ২১ এপ্রিল থেকে টানা ৫০ দিন দিবাকালীন রিলে অনশনের পর ১৩ জুন থেকে শুরু হয়েছে ৭২ ঘণ্টা করে রিলে অনশন। শ্রমিকদের প্রাপ্য আদায়ের দাবিতে আজ চলমান আন্দোলনের ৮০ দিন। সাংসদ থেকে বিধায়ক রংবেরঙের অনেক নেতা ও মন্ত্রী এসেছেন সংহতি জানাতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শ্রম দপ্তর দুটো ত্রিপাক্ষিক মিটিং করলেও সমাধান সূত্র মেলেনি। অতঃপর শ্রমিকরা দাবি আদায়ে অনড়। শুধুমাত্র প্রফিডেন্ড ফান্ড বা গ্রাচুইটির অভিযোগ নয়, বাগানে অভিযোগের তালিকাটা অনেক বড়। যেমন শ্রমিকদের ৪৫ দিনের মজুরি এখনও বকেয়া। চা বাগান স্টাফ, সাব স্টাফ এবং সুপারভাইজার কর্মীদের অন্তত ৫ মাসের বেতন এখনও বকেয়া। অনেকে UAN নং পাননি। ফলে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ঢোকেনি একাউন্টে। রয়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। পর্যাপ্ত ডাক্তার এবং নার্স তো নেই-ই, বরং এম্বুলেন্সের জন্য শ্রমিকদের থেকে আলাদা করে টাকা নেওয়া হয়ে থাকে। বাগানের প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতেও নাকি বন্ধ চা চাষ। সেই জমি ভরে গিয়েছে আগাছায়। অভিযোগ, চা পাতা নাকি অন্যত্র বিক্রি করছে মালিকপক্ষ। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। চূড়ান্ত অনটন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন লং ভিউ বাগানের শ্রমিকরা। বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছেন আন্দোলনের পথ।

উত্তরবঙ্গ চা বাগানে কাজ করেন প্রায় ৩ লাথ শ্রমিক। গত দুই দশকে ৩০টিরও বেশি চা বাগান বন্ধ হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে চা শিল্পে। শ্রমিকরা অভিযোগ তুলেছেন, কাঠভাঙ্গা পরিশ্রমের পর যে মজুরি পেয়ে থাকেন তা যৎসামান্য। নেই কাজের সুরক্ষা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা। শ্রমিক মহল্লায় ঘরগুলি জরাজীর্ণ। রয়েছে ভয়াবহ পানীয় জলের সংকট। ঘরে ঘরে পেটজ্বালা, অভাব চূড়ান্ত। অপুষ্টিতে ভুগছে শিশুরা। রক্তাল্পতা দেখা দিয়েছে মহিলাদের মধ্যে। সমীক্ষা বলছে, কাজের খোঁজে শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। চা বাগান শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজের মজুরি ও কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে ট্রেড ইউনিয়ন, মালিকপক্ষ এবং রাজ্য শ্রম দপ্তরের মধ্যে একাধিক বৈঠক ও আলোচনা হলেও মালিকপক্ষ সেইসব বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি।
বাংলার গৌরব দার্জিলিং চা। কিন্তু তার উল্টো দিকেই রয়েছে চা শ্রমিকদের উপর শোষণ, অত্যাচার ও বঞ্চনার ছবি। লংভিউ চা বাগানের আন্দোলন সেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে।

94 Views