নোটন কর
গত ১১ জুলাই ২০২৬, দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ সূত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক (এমএইচএ) রাজ্য ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রকগুলিকে তাদের এক পুনরায় নির্দেশে বলেছে যে, যখনই সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ এবং জাতীয় স্তোত্র (গান) ‘বন্দে মাতরম’ উভয়ই পরিবেশিত হবে, তখন যেন তা জাতীয় সঙ্গীতের আগে বাজানো হয়। এই নির্দেশ ‘কঠোরভাবে মেনে চলতে’ হবে।
৯ জুলাই, রাজ্যগুলির মুখ্যসচিব এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সচিবদের কাছে লেখা এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের যুগ্ম সচিব ‘জাতীয় সঙ্গীত’:সংক্রান্ত আদেশ উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, যখন জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় স্তোত্র (গান) গাওয়া বা বাজানো হবে, তখন জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ প্রথমে গাওয়া বা বাজানো হবে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় স্তোত্র (গান) গাওয়ার বা বাজানোর সময়, ‘এগুলোর সঠিক লিপি/পাঠ এবং শব্দচয়ন/উচ্চারণ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে’।
এর আগে, ৬;ফেব্রুয়ারি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MHA) রাজ্য এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে একগুচ্ছ নির্দেশাবলীতে বলে দিয়েছিল যে, প্রায় ৩.১০ মিনিট দীর্ঘ ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবকই যেন সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া বা বাজানো হয় এবং জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-র চেয়ে এই গানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
‘মা’ হিসেবে কল্পিত ভারতকে অভিবাদন জানিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং এটি ১৮৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে তাঁর উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে, জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ তাদের সমাবেশে এই গানের প্রথম দুটি স্তবক ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বাধীনতার পর ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সংবিধান এই গানের দুটি স্তবককে জাতীয় স্তোত্রের (গানের) মর্যাদা দেয়।
গত ৫ মে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ‘জাতীয় সঙ্গীত সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ আইন, ১৯৭১’ (The Prevention of Insults To National Honour Act, 1971) সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে, যার ফলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার ক্ষেত্রে যেকোনও ধরনের অপমান বা বাধা প্রদানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই সংক্রান্ত একটি বিল আগামী ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে উত্থাপন করা হতে পারে। বর্তমানে, ১৯৭১ সালের আইনে জন গণ মন, জাতীয় পতাকা এবং ভারতের সংবিধানের অবমাননার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর শাস্তি হিসেবে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে (সূত্র : দ্য হিন্দু পত্রিকা ১১ জুলাই, ২০২৬)।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কেন বন্দে মাতরম গানের দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস? এই গান নিয়ে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে আপত্তি তৈরি হয়। কারণ গানটিতে ভারতের ‘মা’ রূপ হিসেবে দেবীমূর্তি উপস্থাপিত হয়েছে, যা ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মুসলিম সমাজ ও তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রান্তিকভাবে দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এই বিতর্ক চরমে পৌঁছায় ১৯৩৭ সালে। অবিভক্ত ভারতে নির্বাচনের পর একাধিক প্রদেশে কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়। বিধানসভায় বন্দেমাতরম গাওয়া হলে বহু মুসলিম সদস্য আপত্তি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গানের পৌত্তলিক ভাব তাঁদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে। কংগ্রেসের পক্ষে তখন এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। একদিকে বন্দেমাতরম ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে মুসলিম আপত্তিকে উপেক্ষা করাও সম্ভব ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে নেহরু, মাওলানা আজাদ প্রমুখ নেতারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চান। সুভাষচন্দ্র বসুও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখে তাঁর মতামত জানতে চান। রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টভাবে জানান, বন্দেমাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া যথেষ্ট। তাঁর মতে, দেশকে দেবী হিসেবে কল্পনা করা মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় পরিসরে এমন গান সর্বজনীন হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ লিখিতভাবে বলেন, আনন্দমঠ সাহিত্য হিসেবে মূল্যবান, কিন্তু রাষ্ট্রসভায় সকল ধর্মের মিলনক্ষেত্রে এই গানের সব স্তবক সংগত নয়। রবীন্দ্রনাথের মতামতের ভিত্তিতেই ১৯৩৭ সালের ২৬ অক্টোবর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, বিধানসভা ও জাতীয় সভাসমিতিতে বন্দেমাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বন্দেমাতরম গানটি বিজেপি ও আরএসএস-এর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে সহজেই মিলে যায় বলেই এই বিতর্ক নতুন করে উসকে দেওয়া হচ্ছে।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।


