নোটন কর

পশ্চিমবঙ্গে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং সংগঠিত অপরাধ রুখতে আজ সোমবার থেকে কার্যকর হচ্ছে ‘গুন্ডাদমন আইন’। নবান্নের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও মজবুত করতে এবং অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতেই এই কড়া আইনি পদক্ষেপ। নতুন এই আইনের নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ় অ্যাক্ট, ২০২৬’। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই আইন বলবৎ হওয়ার পর পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।

নতুন এই আইনের রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, অপরাধ দমনে প্রশাসনকে এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনের প্রধান দিক হল, বিনা বিচারে ১ বছর পর্যন্ত আটক ও এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা নিবর্তনমূলক আটকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, প্রশাসন যদি মনে করে, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন কিংবা কোনও বড়সড় সমাজবিরোধী অপরাধের চক্রান্ত করছেন, তবে অপরাধ ঘটানোর আগেই তাঁকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১২ মাস অর্থাৎ ১ বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ একে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’ (এনএসএ)-এর সমকক্ষ বলে মনে করছেন।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ বা এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা যদি নিশ্চিত হন যে, কোনও দাগী অপরাধী বা গুন্ডা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সেই অপরাধীকে অনধিক এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সমগ্র জেলা থেকে ‘বহিষ্কার’-এর নির্দেশ দিতে পারবেন।

নয়া এই আইনে জামিন-অযোগ্য ধারা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও রাখা হয়েছে। আইনটিকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে এর আওতাধীন সমস্ত অপরাধকে সম্পূর্ণভাবে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। এর ফলে পুলিশ কোনও পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং আদালত থেকে সহজে জামিন পাওয়া অপরাধীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তা-ই নয়, কোনও ব্যক্তি সমাজবিরোধী বা সিন্ডিকেটের মতো সংগঠিত অপরাধের মাধ্যমে যদি কোনও সম্পত্তি বা টাকা উপার্জন করেন, তবে সেই সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার আইনি অধিকারও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে।
নতুন আইনে ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ শব্দের সংজ্ঞা ও পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত করা হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, নিম্নলিখিত অপরাধগুলিকে এই আইনের আওতায় কঠোরভাবে দমন করা হবে। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটরাজ, তোলাবাজি এবং গায়ের জোরে সাধারণ মানুষের জমি বা বাড়ি দখল করা, বেআইনিভাবে নদী থেকে বালি তোলা, অবৈধ খনি কারবারকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য করা হবে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেওয়াও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বলে ধরা হবে। পাশাপাশি আধুনিক যুগের সাইবার অপরাধ এবং বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতিকেও এই আওতায় আনা হয়েছে।

আন্দোলন বা ক্ষোভ-বিক্ষোভের নামে সরকারি এবং বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের প্রবণতা রুখতেও এই আইনে কড়া বিধান রয়েছে। ট্রেন-বাস পোড়ানো, সরকারি ভবনে ভাঙচুর বা পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঠেকাতে এই আইনের পাশাপাশি কার্যকর হচ্ছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এর অধীনে একটি বিশেষ ‘ক্লেম কমিশন’ গঠন করা হবে। কোনও দাঙ্গা, বিক্ষোভ বা হিংসাত্মক আন্দোলনের জেরে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ চিহ্নিত অভিযুক্তদের থেকে উশুল করবে এই কমিশন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এইসব আইনের বলে সরকার বিরোধী কন্ঠস্বরকে দমন করবে। সূত্রের খবর, নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠন এপিডিআর নয়া এই আইনের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে।

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী

91 Views