নোটন কর
ছবি : পার্থ মিত্র
বিধানসভা ভোটের প্রচারে শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং হিমন্তবিশ্ব শর্মার দেখানো পথে ‘সকালে জমা করে, বিকেলে খরচ করে দেওয়া হবে।’ উল্লেখ্য, গত মে মাসে উত্তরপ্রদেশে ৩৫টি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বারুইপুরে এক নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের যে ঘটনা নিয়ে প্রথম শোরগোল ও প্রতিবাদ হল, সেই কাণ্ডে ধৃত অন্যতম অভিযুক্ত একজনকে দ্রুত ‘খরচ’ (এনকাউন্টার) করে দেওয়া হল! বিকেলে নয়, মধ্যরাতে। আদালত বা বিচারের কোনও তোয়াক্কা করা হলো না। সব এনকাউন্টার হত্যায় পুলিশ যা বলে, এখানেও সেই বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য রাত একটায় আসামীকে উক্ত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন আসামী একজন পুলিশের বন্দুক ছিনতাই করে গুলি চালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশ গুলি চালিয়ে আসামীকে মারে। উত্তরপ্রদেশ-সহ আসাম, কাশ্মীরে গুলি চালিয়ে এনকাউন্টার হত্যার পর ঐসব রাজ্যের পুলিশ বা সেনাবাহিনী এইরকম বিবৃতিই দেয়। যা আমাদের কাছে অতি পরিচিত পুলিশি বয়ান। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবে প্রশ্ন ওঠে আসে, এত পুলিশি ঘেরাটোপে একজন অভিযুক্ত আসামী কি করে পুলিশের বন্দুক কেড়ে নিতে পারে! আর রাত একটায় কি জন্য ঘটনার পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে? ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের আধিকারিক নেওয়া হয়নি কেন? এরকম নানা আইনি ও অধিকারের প্রশ্ন ওঠে আসে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতা হাতে পেতেই বুলডোজার দেখা দেয়। আর বুলডোজার চালিয়ে শ্রমজীবীদের রুজিরুটি কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবার এনকাউন্টারও এসে পড়ল। বিরোধী দলসহ গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, উত্তরপ্রদেশের যোগী-রাজের মডেল এ রাজ্যেও শুরু হলো। ঘটনার সাক্ষী লোপাটের চেষ্টা হল কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা। নৃশংস ঘটনায় অভিযুক্ত হলেও অভিযোগ প্রমাণের আগে এবং আইনি পথে শাস্তির ব্যবস্থা না-করে কেন রাতের অন্ধকারে অভিযুক্তকে নিকেশ করে দেওয়া হল, সেই প্রশ্নও তুলেছে বিভিন্ন সংগঠন। ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্তদের এনকাউন্টার করে দেওয়ার একাধিক দৃষ্টান্ত বিভিন্ন রাজ্যে আছে। পক্ষান্তরে, বিজেপির দাবি, পূর্ব ঘোষণা মতোই কাজ করেছে তাদের সরকার। অপরাধীদের যে রেয়াত করা হবে না, প্রথম সুযোগেই তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, প্রকৃত দোষীকে আড়াল করার জন্য কোনও ব্যক্তিকে এনকাউন্টারের নামে হত্যা করা করা হয়। বারুইপুরের ঘটনায় একমাত্র রাজসাক্ষী ছিল অভিযুক্ত। ঘটনায় যুক্তদের নাম অভিযুক্ত বলে দিয়েছিল। এই অভিযুক্তর কাছ থেকে প্রথম দিন থেকেই এই নারকীয় ঘটনার সাথে যুক্ত বহু তথ্য পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে মূল অভিযুক্তের নাম। এমনকি, এই ব্যক্তি মিডিয়ার সাথে কথা বলেছে, মূল অভিযুক্তদের নাম সামনে নিয়ে এসেছে। বলাই বাহুল্য, এই অভিযুক্তর থেকে এই ঘটনার সাথে জড়িত আরও বহু তথ্যই পাওয়া যাচ্ছিল, হয়তো আরো পাওয়া যেতো। বারুইপুর কান্ডে ধৃত অভিযুক্তকে এনকাউন্টারে হত্যা না করলে তার থেকে হয়তো আরও বহু অজানা তথ্য উদ্ধার করা যেতো, এখন তার আর কোনো উপায় অবশিষ্ট রইলো না। ঘটনার পর এলাকাবাসীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন মূল অভিযুক্তকে এলাকার শাসকদলের নেতার কথায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
এই বিচারবহির্ভূত এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এটা আইনের শাসন নয়। ফ্যাসিস্ট শাসন। বুলডোজার, এনকাউন্টার! কিছু মিডিয়া, টিভি চ্যানেল এই ঘৃণ্য কাজ সমর্থন করছে। এটা ক্ষমাহীন অপরাধ। কেউ দোষ করলে পুলিস গ্রেফতার করবে, আদালত বিচার করবে, শাস্তি দেবে। এটাই ভারতের সংবিধান। তার বাইরে কোনও হত্যাই সমর্থনযোগ্য নয়। গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) মুখ্যমন্ত্রী বারুইপুর গিয়ে জেলার পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নিশ্চিন্তে থাকুন, প্রথমটার বিচার দেব, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেব। মোট চারটি মামলা হয়েছে। এই জঘন্য ঘটনা ছাড়াও আরও তিনটি। ঘটনার পর এলাকার মানুষ একজন অভিযুক্তকে জনরোষে মেরে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, মব লিঞ্চিং যেভাবে হয়েছে, তাতে একটা কমিউনাল অ্যাঙ্গল ছিল। রেলপথকে যেভাবে ওপড়ানো হয়েছে, তাতে ওঁর অতীত ইতিহাস মনে পড়েছে। যেমন সিএএ বিরোধী আন্দোলন, বা কিছুদিন আগের ওয়াকফ আন্দোলন ও পার্ক সার্কাসে এসআইআর বিরোধী আন্দোলন। এই কমিউনাল অ্যাঙ্গলের ব্যাপারটা মুখ্যমন্ত্রীর কথা থেকেই প্রথম জানা গেল। স্থানীয় মানুষ থেকে বিরোধী নেতা পর্যন্ত কেউ এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক কিছু আছে বলে দাবি করেনি। এছাড়াও সিআরপিএফ এর দুজন জওয়ান আহত হওয়া এবং পুলিশের গাড়িকে জ্বালানোর মতো বাকি তিনটে বিষয় উল্লেখ করে তিনি বিরোধীদের খোঁচা দিয়ে বলেছেন, এসবে যাঁরা যুক্ত, যাঁরা অতৃপ্ত আত্মা, ভোটে হেরে যারা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন, এখনও ঢুকে আছেন, এরা মিলে এই তিনটে কান্ড করেছে, এদেরও ভুগতে হবে। শুনে মনে হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীই এখন থেকে কোন ঘটনায় ক্যাপিটাল প্যানিশমেন্ট বা লাইট পানিশমেন্ট হবে সেটা ঠিক করে দেবেন। আইনি বা বিচার প্রক্রিয়া বলে কিছু থাকবে না। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর সেই রাতে অভিযুক্তকে এনকাউন্টার করে দেওয়া হল।
কিছুদিন আগে রাজ্যে পাশ হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল’ যা ‘গুন্ডা দমন’ বিল নামে পরিচিত। এই বিল আইন হয়ে উঠলে নেহাতই সন্দেহের বশে যে কোনও ব্যক্তিকে আটক করতে পারবে পুলিশ। কোন সূত্রের বা তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে, তা জানাতে পুলিশ বাধ্য থাকবে না। সন্দেহভাজনকে আটক রাখা যাবে এক বছর। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক যে কোন জায়গায় তল্লাশি চালাতে পারবেন। আটক ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন না। ওই আইনে আটক ব্যক্তির শুনানি হবে একটি অ্যাডভাইজারি বোর্ডে। সেই বোর্ডে অভিযুক্ত তাঁর পক্ষে সওয়াল করার জন্য কোনও আইনজীবী কিংবা প্রতিনিধি রাখতে পারবেন না। এমন আরও কিছু দানবীয় ধারা, এই আইনে রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় বারুইপুরের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় দুশো জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আসলে, গুন্ডা দমন আইন প্রয়োগ করে প্রতিবাদীদের ও বিরোধীদের কন্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেবার চক্রান্ত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কমিউনাল অ্যাঙ্গলের কথা। ঘটনার এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। ফলে এলাকাবাসীরা অধিকাংশই মুসলিম ধর্মাবলম্বী। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের দর্শন অনুযায়ী বক্তব্য রেখেছেন। একজন মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক পদে বসে কোনও তদন্ত ছাড়া এধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলতে পারেন না। সমস্যা হল, ধর্ষণের মতো অপরাধ, তেমন ঘটনায় অপরাধীদের আড়াল করা দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক প্রবণতা, এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে এমনই অধৈর্য করে যে, তাৎক্ষণিক বিচারের অত্যন্ত অনৈতিক, অসাংবিধানিক ও বিপজ্জনক দাবিটিও ক্রমে জনমানসে বৈধতা অর্জন করতে থাকে। এতখানিই যে, কোনও নেতা যদি পুলিশ এনকাউন্টারের পক্ষে সওয়াল করেন, জনমানসে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। যে পুলিশকর্মী আইনের তোয়াক্কা না করে অভিযুক্তকে ‘খরচ’ করেন, সমাজের একটি বড় অংশ তাঁকে বলিউড কায়দায় নায়ক-সম জ্ঞান করতে থাকে। কিন্তু, এই ধরনের অসচেতন জনগণের ভাবনা বোধ দ্বারা প্রশাসন চালিত হতে পারে না, তাকে সাংবিধানিক নৈতিকতায় স্থিত থাকতে হয়।
বারুইপুরের ঘটনার নৃশংসতা প্রশ্নাতীত। অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি হোক। কিন্তু, ভারতীয় গণতন্ত্রে পুলিশের শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই। তাদের কাজ অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে তা আদালতে পেশ করা, বিচারের দায়িত্বটি আদালতের উপরেই ন্যস্ত। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির এনকাউন্টার-সংস্কৃতি অতি বিপজ্জনক। পশ্চিমবঙ্গ যেন সেই ভয়ঙ্কর পথে পা না বাড়ায়, তা অবিলম্বে নিশ্চিত করা জরুরি। গত শতাব্দীর ‘৭০-এর দশকে পঃবঙ্গে এই এনকাউন্টার সংস্কৃতি চালু ছিল। পুলিশ বা সিআরপি দিয়ে নকশালপন্থী নেতা ও কর্মীদের হত্যা করা হতো। বহু আন্দোলনের চাপে বাংলায় এই সংস্কৃতি প্রায় লোপ পায়। এখন রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসে আইন বহির্ভূত এনকাউন্টার রাজ চালু করার চেষ্টা করছে। এর বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষকে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। পথে নামতে হবে।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী ।

