ওয়েব ডেস্ক : ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন যে, দিল্লি পুলিশ রাতে বা ভোরের দিকে তাদের প্রতিবাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পরিকল্পনা করছে – যুবকদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় একথা বলেছেন তিনি। জনগণকে তাদের সঙ্গে রাতভর প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দীপকে এদিন আরও বলেন, ২০ জুলাই সোমবার প্রস্তাবিত ‘চলো সংসদ’ পদযাত্রা পরিকল্পনা অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে সোনম ওয়াংচুককে তাঁর অনির্দিষ্টকালের অনশন ২১তম দিনে পদার্পণ করার পর যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হলেও হাসপাতালে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এদিন সন্ধ্যায় জানিয়েছে, পানিশূন্যতা এবং বিপাকীয় অস্বাভাবিকতার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তিনি সারাদিন ধরে শিরায় তরল, মুখে খাওয়ার রিহাইড্রেশন সলিউশন এবং অন্যান্য ওষুধ নিতে অস্বীকার করেছেন। হাসপাতাল তার সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, চিকিৎসাকারী দলের সঙ্গে এইমস-এর একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একমত হয়েছেন যে সোনম ওয়াংচুকের ‘অবিলম্বে চিকিৎসা হস্তক্ষেপ’ প্রয়োজন। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমো হাসপাতালে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন এবং এই আন্দোলনকারীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর, তাঁর পরিবারের এবং, ‘গত ২০ দিন ধরে তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী’ চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া মিঃ ওয়াংচুককে মুখে বা শিরায় কোনও কিছু দেওয়া উচিত নয়।

প্রসঙ্গত, এদিন সকালে সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চ থেকে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। এই পুলিশকর্মীরা সাদা পোশাকে ছিলেন বলে খবর। ওয়াংচুককে স্থানান্তরিত করার পর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করার ঘোষণা করেন।
সতীশ গোলচারের জায়গায় অনুরাগ কুমার দিল্লি পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের একদিন পর এদিন সকালে পুলিশ এই পদক্ষেপ করে। পুলিশ দাবি করেছে যে, ওয়াংচুকের ‘ক্রমশ অবনতিশীল স্বাস্থ্য অবস্থার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে’ হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এদিন একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ওয়াংচুকের কাছে পুলিশকে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল প্রতিবাদীরা। কিন্তু পরে তাদের পরাস্ত করা হয়। পুলিশ ওয়াংচুককে সরানোর সময় তাঁর চারপাশে সাদা চাদর দিয়ে একটি আবরণ তৈরি করে। এরপর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো পৌঁছন। তিনি এক্স-এ বলেন, ‘আমার, তাঁর পরিবারের এবং গত ২০ দিন ধরে তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী চিকিৎসকদের অনুমতি ছাড়া তাঁকে মুখে বা শিরায় কিছু দেওয়া উচিত নয়।’

ওয়াংচুক এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর তিনজন পড়ুয়া নেহা, আমেন এবং মনীশ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ভারতের পরীক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন করছেন।
এদিন সকালে বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত প্রতিবাদী পড়ুয়ারা আইসা-র তিনজন অনশনকারীকে ঘিরে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে, যাতে পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে যেতে না পারে। অনশনের কারণে যথেষ্ট দুর্বল হয়েছে নেহা। এদিন তিনি একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ওয়াংচুককে আটক করার পর পুলিশ আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের চারপাশে অনেক স্বেচ্ছাসেবক থাকায় তারা পারেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ জোর করে ভেঙে দেওয়ার পুলিশের এই প্রচেষ্টা লজ্জাজনক। সরকার ২০ দিন ধরে আমাদের, ছাত্রছাত্রীদের এবং ওয়াংচুককে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। এখন, তার উপর ২১তম দিনে তারা সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করছে।’

এর আগে, সিজেপি-র মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্স-এ বলেছিলেন যে, সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা দীপকে যেখানে এখন থাকেন, সেই জায়গা ঘিরে ফেলেছিল পুলিশ। এনসিপি-র মুখপাত্র অনীশ গাওয়ান্ডেও বাড়িতে এখন দীপকে থাকেন। তিনিও একথা জানান। দীপকে এক ভিডিও বার্তায় জানান যে, পুলিশ তাকে ‘মারধর করেছে এবং আটক করেছে’। যদিও পরে তাকে ছেড়ে দিয়েছে। অভিযোগ, এদিন যন্তর মন্তরে সিজেপি বিক্ষোভকারীদের ওপর মারাত্মকভাবে লাঠিচার্জ করা হয়েছে। স্লোগানরত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দিল্লি পুলিশ আজ এতটাই নিচে নেমেছে।’
এতদিন ধরে সিজেপি এবং আইসা বিক্ষোভকারীদের জন্য দুটি পৃথক স্থান ছিল। কিন্তু এদিন সকালে সিজেপি নেতারাও আইসা এলাকার আশেপাশে বক্তব্য রাখেন এবং বলেন যে, নেহা, আমেন এবং মনীশ তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন। সিজেপিও তাদের দাবি পরিবর্তন করেছে বলে মনে হচ্ছে – আগে তারা শুধু প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানালেও, পুলিশের পদক্ষেপের পর তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগেরও দাবি জানিয়েছে।

পরে, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দীপকে মোদীকে স্বৈরশাসক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এরা পুলিশ অফিসার নয়; এরা আরএসএস-এর গুন্ডা। আমি বিদেশ থেকে আমার দেশে ফিরেছি; আমি কি অপরাধী? এরা গুন্ডা – পুলিশ নয়, আরএসএস-এর গুন্ডা…’। জোর করে ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছে সব বিরোধী রাজনৈতিক দলই। যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে দেশের বিশিষ্টজনদের অনেকেই। বিভিন্ন তরফ থেকে ২০ জুন সিজেপির সংসদ অভিযানে সামিল হওয়ার জন্য আহ্বান জানানোও হয়েছে। এদিন সমাজকর্মী আন্না হাজারে বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ওয়াংচুকের সঙ্গে আলোচনা করা। তিনি একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সরকারের উচিত নয় তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া। তাঁর দাবিতে হ্যাঁ বা না বলুন, কিন্তু আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়?’

104 Views