ওয়েব ডেস্ক : রাজস্থানের বারমের জেলায় বেশ কয়েকটি মসজিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে পথে নামলেন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। বুধবার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ প্রশাসনের এমন পদক্ষেপের প্রতিবাদে একটি ‘সর্বধর্ম শান্তি সভা’য় মিলিত হন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা-সহ পোস্টার হাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বারমের জেলাশাসকের কার্যালয়ের বাইরে সমবেত হন। সেখানে ‘মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম’, ‘আসুন মিলিত হয়ে মিশ্র সংস্কৃতি রক্ষা করি’, ‘ঘৃণা ত্যাগ করুন, ভালোবাসার প্রসার ঘটান’ এবং ‘আমাদের পরিচয় ভ্রাতৃত্ব ও মানবতা’—এর মতো স্লোগান দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, চারটি মসজিদ ভেঙে ফেলা এবং আরও কয়েকটির ক্ষেত্রে নোটিশ জারি করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ মানুষের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়। আয়োজকরা জানান, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় ধর্মীয় স্থানগুলোতে তথাকথিত ‘অবৈধ দখল’ উচ্ছেদের পদক্ষেপ করছে প্রশাসন। এদিন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই সভা সংগঠিত করা হয়।

সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তি-সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এই সমাবেশে অংশ নেন। এই সভার থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে জেলাশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। এতে সীমান্তবর্তী এলাকায় চলমান কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে চলা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার দাবি জানানো হয়।
এই সভার অন্যতম আয়োজক আজাদ সিং রাঠোর ‘দ্য হিন্দুস্তান গেজেট’-এর প্রতিনিধির কাছে সরকারের কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় জমির সীমানা বা অবস্থান চিহ্নিত করার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল বলে উল্লেখ করেন তিনি। কারণ, এখানে প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকাই হলো এমন জমি, যার কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা নথিপত্র নেই। সরকার একটি বাছাইমূলক নীতি গ্রহণ করছে—যেখানে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বাড়িঘর উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। এটাই মূল সমস্যা। রাঠোর বলেন, আমাদের দাবি হলো, যেসব বাড়ি আবাসিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়, সেগুলোকে বৈধতা বা নিয়মিতকরণের আওতায় আনা হোক। রাঠোর আরও বলেন, যেসব মসজিদের ক্ষেত্রে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত এবং আইনানুগ সুযোগ থাকলে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বিষয়টি কেবল মসজিদ বা মন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব আবাসিক বাড়িঘরের ওপরও পড়ছে। এর ফলে সবাই গৃহহীন হয়ে পড়বেন বলে সতর্কও করেন তিনি। এছাড়াও রাঠোর বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। আমাদের এখানে জল ও বিদ্যুতের সুবিধা নেই। আমরা একাধিক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছি। আমরা যুদ্ধের একেবারে সম্মুখসারিতে অবস্থান করছি। আপনারা যদি আমাদের কোনও উপকার করতে না-ও চান, অন্তত আমাদের যা আছে তা কেড়ে নেবেন না। ভারতের সব গ্রামই যে আবাসিক এলাকার সীমানার মধ্যে অবস্থিত তা কিন্তু নয়, বলেও জানান তিনি। সমাবেশে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, বারমারের পরিচিতি ঐতিহাসিকভাবেই সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁরা সাংবিধানিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

এই সভায় বারমারের সাংসদ উম্মেদরাম বেনিওয়াল, বাইতুর বিধায়ক হরিশ চৌধুরী এবং প্রাক্তন বিধায়ক পদ্মারাম মেঘওয়াল, উদরাম মেঘওয়াল, লক্ষ্মণ গোদারা, প্রিয়াঙ্কা মেঘওয়াল-সহ অন্যান্য নেতারা বলেন যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিক ঐক্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই সর্বদা বারমারের শক্তির উৎস হয়ে রয়েছে। এদিকে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস’ (APCR)-এর সম্পাদক ও সমাজকর্মী নাদিম খান জানিয়েছেন যে, রাজস্থানের চারটি জেলা জয়শলমীর, বিকানীর, শ্রীগঙ্গানগর ও বারমের জুড়ে বিস্তৃত ১,০৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত ৩৫০টি মসজিদকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ‘অপারেশন সুইপ’-এর আওতায় রাজস্থান প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে৷ বিশেষ করে বারমের ও জয়শলমীর সেক্টরের ওপর এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বেছে বেছে মুসলিম এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির উপর নিয়মকানুন প্রয়োগ করছে প্রশাসন।

সৌজন্যে : দ্য হিন্দুস্তান গেজেট, ২৫ জুন ২০২৬
(thehindustangazette.com)

78 Views