সুকুমার মিত্র
ছবি বিশ্বাসের নাম বাংলা সিনেমার দুনিয়ায় যতটা বড়, তাঁর জন্মভূমি ছোটো জাগুলিয়ার মাটির গন্ধটা ঠিক ততটাই নরম আর নিঃশব্দ। মনে পড়ে কাবুলিওয়ালার সাদা দাড়ি, সেই ভেজা গলিতে হঠাৎ করে প্রাণখোলা হাসিমাখা একটি প্যাটার্নের মতো গর্ব করত যে, ‘আমি আছি’—তেমনি ছবি আছেন আমাদের ছবির প্রান্তরেই, কিন্তু আমরা তাঁর কথা ভুলে গেছি। আজ কিংবদন্তী অভিনেতার ১২৬তম জন্মদিন একথা ক’জনই বা মনে রেখেছেন জানা নেই। তবে কয়েকজনকে প্রশ্ন করলে আকাশ থেকে পড়েছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কালী নিবাস ফলকটি আছে জীর্ণ দেওয়ালে, আছে ঘর সংলগ্ন শিব মন্দির। তাঁর জনপ্রিয় সিনেমাগুলির সঙ্গে এই প্রজন্মের এক বড় অংশ পরিচিত না হলেও আপামর বাঙালি তাঁকে বহুকাল মনে রেখেছে। পরিচিত মহানায়ক উত্তম কুমারও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালো বাসতেন তাঁর অভিনয়। সিনেমার নীল-নীল রঙে, বালুচরের মতো মিশে আছে তাঁর রূপচিত্র—একটু ভাঙা, একটু বিদ্রোহী, কিন্তু আদরের ঢেউয়ালা। ‘আঁধারের আড়ালে থেকেও তোমায় ভালবাসি’—এমন গানের সুরে যেন ছবি হাঁটে, কাঁধে ভার ছুঁয়ে দিয়ে যায় জনপদের সব কোমল কথা। ছোটো জাগুলিয়ার কাঁধে জন্ম নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন, কিন্তু আমাদের শহুরে স্মৃতি তাঁকে বড় করে নিয়েছে; ফলত সেই মাটির কণায় লুকিয়ে থাকা গন্ধটি আমরা ভুলে গেছি। কাবুলিওয়ালা যখন মিনুকে ‘তুমি কি বাবার কাছে যাবে, মিনি?’ — এই সংলাপ বারবার ফিরে আসে, যেন কাবুলিওয়ালার সুদুরে কাবুলে তাঁর মেয়ের প্রতি আকুলতা।
আর একটা খণ্ডের স্মৃতি উঠে আসে—সেই ক্লাসিক নায়কের ব্যথা, যিনি চুপচাপ নিজের ভালবাসা ঢেকে রাখেন, কিন্তু চোখে এক অভিমানী হাসি রাখেন। ছবির উপস্থিতি যেন তাঁদের সব ক্ষুধা, সব আকাঙ্ক্ষা পুষে দেয়; তাঁর কাজগুলোই তো যুগের ব্যথা ও প্রেম একসাথে গেঁথে দিয়েছে। ছোটো জাগুলিয়ার নীরব সন্ধ্যা, খেটে খাওয়া মানুষের কথা, স্কুলপথের লুকোচুরি—এসবই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন পর্দায়, কিন্তু আমরা ফিরে তাকাইনি সেই খাঁটি উৎসের দিকে।
আজ ১২৬তম জন্মদিনে আমি চাই—এক কাপ বর্ষার চা, কাদা-মাখা সাইকেল, আর কিশোর-হৃদয়ের মতো সরল চোখে দেখে নেবো সেই ছোটো জাগুলিয়াকে। ছবি বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনি তাঁরই জন্মভূমিতে—নিষ্পাপ আলোয়, মাটির ঘ্রাণে, গ্রামের পুকুরের চুপচাপ ঢেউয়ে। গানে, কথায়, সিনেমায় যেভাবে তিনি আমাদের মানুষ করে তুলেছিলেন, তেমনি করে আজ আমাদের স্মৃতিকে মেলে ধরা। কাবুলিওয়ালার মতো নির্ভীক প্রেম আর মৃল্যবান উদাসীনতা মিলে বলবে—’তুমি ভুলবে না অন্তত এই জন্মভূমিকে’। কারণ, যে মানুষ ছবি করেছিলেন আমাদের জীবনের ছোট-বড় সব টুকরোগুলো নিয়ে, তিনি ফিরে পাবেন শান্তি, যদি আমরা তাঁর মাটিকে নাম দিয়ে ডাকি — ছোটো জাগুলিয়া। চোখ ভরা স্মৃতি নিয়ে ছবি বিশ্বাস সরণি দিয়ে ফিরে যাওয়া যাক, আর বলি—জন্মদিনে মাটিকে স্যালুট।


