আশিস কুমার ঘোষ, কলকাতা
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরতে ২৫ জুলাই শনিবার মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসে একটি সচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করল।এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মণিপাল অনকোলজি সার্ভিসেস-এর ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট – হেড অ্যান্ড নেক অনকোলজি সার্জারি ডাঃ সৌরভ দত্ত, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – সার্জিক্যাল অনকোলজি ডাঃ হর্ষ ধর, এবং কনসালট্যান্ট– সার্জিক্যাল অনকোলজি ডাঃ কিংশুক চ্যাটার্জি। আলোচনায় মুখের ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসা এবং চিকিৎসার পর রোগীর পুনর্বাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
২৭ জুলাই বিশ্ব হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার দিবস। এ উপলক্ষে আয়োজিত এদিনের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ ক্যানসার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতে পুরুষদের মধ্যে হওয়া মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০ শতাংশই হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার। তামাক সেবন এই রোগের প্রধান কারণ। দুঃখজনকভাবে, অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রোগ অনেকটাই বাড়ার পর ধরা পড়ে, ফলে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায় এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। আলোচনায় রোগের প্রাথমিক লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ, প্রতিরোধের উপায়, আধুনিক চিকিৎসা এবং চিকিৎসার পর পুনর্বাসনের গুরুত্বকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মুখের ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণাও ভেঙে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে কয়েকজন ক্যানসারজয়ী তাঁদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। তাঁরা জানান, সময়মতো রোগ ধরা পড়া, বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের একসঙ্গে চিকিৎসা করা এবং সঠিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাঁরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা সকলকে দ্রুত লক্ষণ চিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
৬০ বছর বয়সি ক্যানসারজয়ী কাঁকুরগাছি বাগমারির বাসিন্দা চন্দ্রকলা মেহতা বলেন, ‘শুরুতে আমি বুঝতেই পারিনি যে আমার সমস্যা এতটা গুরুতর। মুখে একটি ছোট সাদা দাগ দেখেছিলাম, প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ ঘা। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পর চিকিৎসকেরা আমাকে রোগ সম্পর্কে জানান এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন। রোগ ধরা পড়ার খবর শুনে আমি ভেঙে পড়েছিলাম, কিন্তু চিকিৎসক ও হাসপাতালের পুরো দলের সহযোগিতা আমাকে সাহস জুগিয়েছিল। ২৪ মে আমি মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসে ভর্তি হই এবং প্রায় ১০ দিন চিকিৎসার পর নতুন আশা নিয়ে বাড়ি ফিরি। ডাঃ কিংশুক চ্যাটার্জি এবং ডাঃ হর্ষ ধরের কাছে আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা শুধু চিকিৎসাই করেননি, প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছেন। নার্সিং টিম এবং হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীরাও অত্যন্ত যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে আমার পাশে ছিলেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে থাকার জন্য আমি তাঁদের সকলের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।’
ভারতে হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসারের বাড়তে থাকা প্রবণতা এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে এদিন ডা: সৌরভ দত্ত বলেন, ‘ভারতে হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার এখনও একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। পুরুষদের মধ্যে হওয়া মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০ শতাংশই এই ধরনের ক্যানসার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর ক্ষেত্রে রোগ অনেকটাই বাড়ার পর ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায় এবং ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে। তবে শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব এবং রোগীর জীবনযাত্রার মানও ভালো থাকে। মুখে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘা, গলায় অকারণে ফোলা, গিলতে অসুবিধা বা গলার স্বরে পরিবর্তন হলে তা কখনওই অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগের ফল অনেকটাই ভালো হতে পারে।’
চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনের গুরুত্ব নিয়ে ডা: কিংশুক চ্যাটার্জি বলেন, ‘হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসারের চিকিৎসা শুধু অস্ত্রোপচার বা রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই চিকিৎসার ফলে কথা বলা, খাবার গিলতে পারা, খাওয়া-দাওয়া এবং শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক কাজেও সমস্যা হতে পারে। তাই পুনর্বাসন চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সার্জন, মেডিক্যাল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, স্পিচ ও সোয়ালোয়িং থেরাপিস্ট, পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং মনোবিদ—সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় রোগীরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। আধুনিক পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার এবং উন্নত পুনর্বাসনের কারণে বর্তমানে অনেক রোগী সফল চিকিৎসার পর আবার ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে স্বাভাবিকভাবে ফিরে যেতে সক্ষম হচ্ছেন।’

