নোটন কর
ভূমিকা
ভারতে নদী সংযোগ প্রকল্পের ধারণা দীর্ঘদিনের। এই প্রকল্পগুলির উদ্দেশ্য হিসেবে খরা ও বন্যা মোকাবিলা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানীয় জলের সংস্থান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হয়। ‘কেন-বেতওয়া’ নদী সংযোগ প্রকল্প ঘিরে আদিবাসীদের আন্দোলন শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের ‘কেন’ নদীর জল উত্তরপ্রদেশের ‘বেতওয়া’ নদীতে স্থানান্তরের এই প্রকল্পকে সরকার বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের জলসংকটের সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মধ্যপ্রদেশের পান্না ও ছত্তরপুর জেলার বহু আদিবাসী ও বননির্ভর মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের আন্দোলন আজ শুধু একটি আঞ্চলিক প্রতিবাদ নয়, বরং পরিবেশ, গণতন্ত্র এবং আদিবাসী অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকল্প এলাকার কাছে প্রতীকী চিতায় শুয়ে প্রতিবাদ জানান তাঁরা, শোরগোল পড়ে যায় গোটা দেশে। ‘চিতা আন্দোলন’ নিয়ে দেশ জুড়ে চর্চা শুরু হয়। এরপর থেকে কখনও ‘জল সত্যাগ্রহ’ অর্থাৎ কোমর জলে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ, কখনও ‘মাটি সত্যাগ্রহ’, কখনও অনশন চলেছে। অনশনে যোগ দিয়েছেন বিপুল সংখ্যায় গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা। বাদ যায়নি পড়ুয়ারাও। চলতি মাস থেকে শুরু হয়েছে গলায় প্রতীকী ফাঁস পরে প্রতিবাদ। প্রতীকী চিতায় শুয়ে তাঁরা জানিয়ে দেন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ তাঁদের কাছে মৃত্যুর সমান। দফায় দফায় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হলেও এখনও সমস্যার সমাধান হয়নি। ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আন্দোলন। নদীর পাড়ে গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করছেন, তাঁদের জীবনের বিনিময়েই কি উন্নয়ন হবে?
কেন এই প্রকল্প
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ (Ken-Betwa River Linking) প্রকল্পের সূচনা করেন। প্রায় ৪৪,৬০৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে দেশের প্রথম বৃহৎ নদী-সংযোগ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। ২২০ কিলোমিটার খাল কেটে এই দুই নদীকে যুক্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, কেন নদীর অতিরিক্ত জল বেতওয়া নদীতে পাঠানো। দুই নদীর সংযোগের জেরে জলসংকট ঘুঁচবে বুন্দেলখণ্ডের। বুন্দেলখন্ড মূলত উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক এলাকা। এর সবচেয়ে বড় অংশটি মধ্যপ্রদেশে এবং বাকি অংশটি উত্তরপ্রদেশে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি এর মাধ্যমে বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের ৬২ লক্ষ মানুষের পানীয় জলের ব্যবস্থা হবে এবং ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ পৌঁছাবে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অনুসারে এই নদী সংযুক্তির ফলে মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর, পান্না, টিকমগড়, নিওয়ারি, দামোহ, সাগর, দাঁতিয়া, শিবপুরী, বিদিশা এবং রাইসান জেলা উপকৃত হবে। এছাড়াও উত্তরপ্রদেশের মাহোবা, ঝাঁসি, বান্দা এবং ললিতপুর জেলাগুলি উপকৃত হবে। এই প্রকল্প থেকেই ১০৩ মেগাওয়াট হাইড্রোপাওয়ার এবং ২৭ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার তৈরি হবে।
প্রকল্প ঘিরে আশঙ্কা
যদিও আপাত ঝকঝকে এই প্রকল্পের আড়ালে লুকিয়ে বেশ কিছু নির্মম বাস্তব। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের সব হারানোর আশঙ্কা। সরকারের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, দৌধন বাঁধ (Daudhan Dam) নির্মাণের ফলে মধ্যপ্রদেশে ছত্তরপুর জেলার ৫,২৮৮টি এবং পান্নায় প্রায় ১,৪০০টি পরিবারকে বাস্তুচ্যুত হতে হবে। সরাসরি প্রভাবিত হবে মোট ২৪টি গ্রামের মানুষ। যাঁদের অধিকাংশই গোন্দ এবং কোল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। যাদের জীবন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হল বনভূমি। এই প্রকল্পের কারণে যা প্রায় হারিয়ে যাবার মুখে। কাটা পড়বে কয়েক লক্ষ গাছ। এখানেই শেষ নয়, পান্না টাইগার রিজার্ভের বড় অংশ ধ্বংস হবে।
পান্না ও ছত্তরপুর জেলার বহু আদিবাসী পরিবার বনজ সম্পদ সংগ্রহ, ক্ষুদ্র কৃষি, পশুপালন এবং নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল। নদী শুধু জল নয়; এটি তাঁদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং ইতিহাসের অংশ। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বহু গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন প্রায়ই অসম্পূর্ণ বা দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়েছে। তাই আদিবাসীদের আশঙ্কা—তাঁদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অস্তিত্ব চিরতরে বিপন্ন হবে।
আদিবাসীদের আন্দোলন
প্রকল্প ঘোষণার পর থেকে ছত্তরপুর ও পান্না জেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। গ্রামসভা, গণস্বাক্ষর অভিযান, পদযাত্রা, ধর্না, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদান এবং শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। তাঁদের প্রধান দাবিগুলি হলো—
১) জোরপূর্বক উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে।
২) প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
৩) বনাধিকার আইন ও পঞ্চায়েত (এক্সটেনশন টু শিডিউল এরিয়া) অ্যাক্ট বা পিইএসএ আইন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করতে হবে।
৪) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সম্মতি ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না।
৫) প্রকৃত ক্ষতিপূরণ ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এলাকার আদিবাসীদের আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হলো তাঁদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার। বনাধিকার আইন, ২০০৬ (Forest Rights Act) আদিবাসী ও বনবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত বনাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকা সম্প্রসারণ) আইন, ১৯৯৬ (PESA) অনুসারে তফসিলি এলাকার গ্রামসভার মতামত ও সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সবক্ষেত্রে গ্রামসভার স্বাধীন ও অবাধ সম্মতি নিশ্চিত করা হয়নি। তাঁদের মতে, উন্নয়নের নামে এই আইনগুলি সরকার উপেক্ষা করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই লড়াই শুধু ক্ষতিপূরণের জন্য নয়, এটা তাঁদের জমি, জীবিকা, বন, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের পরিচয় রক্ষার আন্দোলন। উন্নয়নের নামে তাঁদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিকে বলি দেওয়া চলবে না। প্রকল্প স্থগিত না করা পর্যন্ত আন্দোলন জারি থাকবে।
পরিবেশগত সংকট
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলির একটি হলো পান্না টাইগার রিজার্ভের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। জলাধার নির্মাণের ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি অংশ নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জঙ্গলের বাঘ, চিতা, শকুন, ঘড়িয়াল-সহ বহু বিরল প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরিবেশবিদদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে গেলে শুধু বন নয়, সমগ্র নদী অববাহিকার বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। নদীর মাছ, জলজ প্রাণী, বনজ উদ্ভিদ এবং স্থানীয় জলবায়ুর পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উপসংহার
কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পকে ঘিরে পান্না ও ছত্তরপুর জেলার আদিবাসীদের সংগ্রাম, উন্নয়নের বিকল্প ধারণা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উন্নয়ন শুধু পরিকাঠামো নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের অধিকার, পরিবেশের সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ভারতের সংবিধান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই যে কোনও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মতামত, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আইনগত অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কেন-বেতওয়া প্রকল্পের বিরোধিতায় আদিবাসীদের সংগ্রাম সেই গণতান্ত্রিক অধিকার ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দাবিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ছত্তরপুরের নদীর ধারে ঝুলে থাকা সেই ফাঁসগুলো তাই শুধু প্রতিবাদের প্রতীক নয়। এই প্রতিবাদ আমাদের উন্নয়ন ভাবনার সামনে ছুঁড়ে দেওয়া এক কঠিন প্রশ্ন।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

