ওয়েব ডেস্ক : নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে এবং বিচার বিভাগ এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে তা ‘প্রজাতন্ত্রের সম্পূর্ণ পতনের’ ইঙ্গিত দেবে বলে সতর্ক করে, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিরোধীরা। শুক্রবার সেই চিঠির পূর্ণাঙ্গ বয়ান প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স বা ইন্ডিয়া’ জোট। ২৩টি বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা ও একজন নির্দলীয় সাংসদের স্বাক্ষরিত ছয় পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাঁরা প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখতেন না। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আমাদের গণতন্ত্র বিপন্ন—এই বাস্তবতার কারণেই আমরা এই ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছি।’
চিঠিতে উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে বিচার বিভাগকে ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। বলেছে, ‘যখন অন্য সব উপায় ব্যর্থ হয়, তখনও মানুষ বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রাখে। তাই বিচার বিভাগ যখন সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা প্রজাতন্ত্রের সম্পূর্ণ পতনেরই ইঙ্গিত দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়লে গণতন্ত্র তখন নৈরাজ্যে পরিণত হয়।’ এতে বলা হয়েছে, ‘তাই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা যেন অটুট থাকে, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবারই দায়িত্ব। আর সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা বিচার বিভাগের ওপর কোনও প্রশ্ন তুলছি না। বস্তুত, যখন অন্য সব ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখনই আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই। কিন্তু যখন আদালতও ব্যর্থ হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—এরপর আমরা কার কাছে যাব?’ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যে একটি সাংবিধানিক আবশ্যকতা, তা উল্লেখ করে বিরোধী দলগুলো বলেছে, ‘যখন কোনও না কোনও ভাবে সেই প্রক্রিয়াটি কলুষিত হয়, তখন নির্বাচনের ফলাফলও প্রশ্নের মুখে পড়ে। জনগণের রায় তখন এই প্রতারণার শিকার হয়।’ তারা আরও বলেছে, বিজেপি-বিরোধী সমমনস্ক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সবাই বিশ্বাস করি যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের ফলাফল জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইন্ডিয়া জোট থেকে দূরত্ব বজায় রাখা আপ এবং ডিএমকে-রও শীর্ষ নেতারাও এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের প্রকাশ্য ও পক্ষপাতমূলক আচরণ। আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন এবং ফলাফলের ক্ষেত্রে বিজেপির প্রতি প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ সমর্থন দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দল যখন ‘আচরণবিধি’ (এমসিসি) লঙ্ঘন করেছে, তখন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি কমিশন। অথচ একই সময়ে বিরোধী পক্ষের ওপর তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
চিঠিতে ইন্ডিয়া জোট উল্লেখ করেছে যে, সবচেয়ে হতাশাজনক ঘটনাটি ঘটেছে যখন নির্বাচন কমিশন এবং বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রতিটি রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সংবিধান এবং ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১’-এর বিধান অনুযায়ী প্রকৃত ভোটারদের তালিকা নিশ্চিত করার কথা বলেছে, অথচ এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। যদিও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দাবি করেছে, ভোটার তালিকা নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করা প্রয়োজন ছিল। এদিন বিরোধী জোট দাবি করেছে যে, বাস্তবে এর ফলাফল হয়েছে ঠিক তার বিপরীত। এসআইআরকে ‘অসময়ের পদক্ষেপ’ এবং ‘বিশাল বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী জোট বলেছে, ‘প্রথমবারের মতো গৃহীত এই নথিপত্র-ভিত্তিক প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত মানুষকে বাদ দেওয়ার কৌশল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফর্ম পূরণ ও নথিপত্র দাখিলের মাধ্যমে ভোটারদের যাচাই-বাছাই এবং নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার ফলে অনেক ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’ এছাড়াও, কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধী জোট জানিয়েছে যে, ইলেকট্রনিক ভোটিং বা ভোটগ্রহণ পদ্ধতি এবং বিশেষ করে ‘ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন’ (ইভিএম)-এর ভূমিকা নিয়েও ‘গুরুতর প্রশ্ন’ উঠছে। উল্লেখ্য, এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সংসদের উভয় কক্ষের বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিএমকে-র তিরুচি শিবা, আরজেডি-র তেজস্বী যাদব, আপ-এর সঞ্জয় সিং ছাড়াও জোটের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা।

সৌজন্যে : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

144 Views