নোটন কর

সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক নতুন প্রবণতা ক্রমশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও কর্মীদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে ডিম ছোঁড়া হচ্ছে, হেনস্থা করা হচ্ছে, কোথাও বা মারধর করা হচ্ছে। মহিলারাও তার থেকে বাদ পড়েছেন না। এই ঘটনাগুলি রাজনৈতিকভাবে এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কও উসকে দিয়েছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে একাধিক তৃণমূল নেতা পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই ডিম হামলার শিকার হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনও পুলিশি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আইনে উল্লেখ আছে, কোনও ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হলেও আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্দোষ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। তাই তাঁর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব।
ডিম ছোঁড়া আইনের চোখে অপরাধ। বেআইনি জমায়েত, সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার মতো ধারায় পুলিশ প্রশাসনের মামলা করা সম্ভব। কিন্তু পুলিশ করছে না।কারণ ডিম নিক্ষেপকারীরা বর্তমান রাজ্য শাসক দলের লোক।
কিছুদিন আগে পূর্বতন শাসকদলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সোনারপুরে দলের এক নিহত কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে যেভাবে তাঁকে হেনস্থা, মারধর, ডিম ও পাথর ছোঁড়া হয় তাতে তাঁর জীবন সংশয় হতে পারতো। পুলিশ তাঁর কর্মসূচি জানা স্বত্বেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি। কৃষ্ণনগর দক্ষিণের প্রাক্তন বিধায়ক ও মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস এবং একজন মহিলাকে মারধরের ঘটনা সমাজ মাধ্যমে এসেছে। সত্তরোর্ধ্ব প্রাক্তন বিধায়কের উপর চড়াও হয়ে লোকজন যারমধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন তাঁকে হেনস্থা, কটু কথা, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে আর ডিম ছুঁড়েছে। একজন পুলিশের উপস্থিতিতে বাধা দিচ্ছিলেন একজন মহিলা। তাঁকে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বার করে চড় থাপ্পড় মারা হল। জামাকাপড় ছিঁড়ে দেবারও চেষ্টা হল। তিনি বলছিলেন, আমি চোর নই, আমি একজন শিক্ষিকা। তারপর শুইয়ে ফেলে কয়েকজন পুরুষ একটা থান জড়িয়ে দিল সেই মহিলার গায়ে। কি বিভষ্য চিত্র এই বাংলায় ওঠে এলো সেদিন! প্রাক্তন মন্ত্রী সরকারের দেওয়া ত্রাণ সামগ্রী ফেরত দেবার আবেদন করেছিলেন। উল্টে তাঁকে চোর অপবাদ দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। কিছুদিন আগে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফলতা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থীকে পুলিশ কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরায়। মালদহের মানিকচকে প্রধান শিক্ষকের গায়ে ডিম ছোঁড়া হয়। রাজ্যজুড়ে চলমান ঘটনার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল।
রাজ্যবাসীর একাংশ বলছে, এই ঘটনাগুলি পূর্বতন শাসকদলের নেতা ও কর্মীদের দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিছু ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে হতে পারে। কিন্তু যেভাবে ও পরিকল্পিতভাবে সারারাজ্য জুড়ে এই একই ধরনের ঘটনা পূর্বতন শাসকদলের নেতা ও কর্মীদের উপর যে কোনও অজুহাতে ঘটানো হচ্ছে তার পিছনে এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে।
বর্তমান শাসকদল বিজেপি ও আরএসএস এক লুম্পেন বাহিনী তৈরি করেছে জনরোষের নাম করে মববাজী (সন্ত্রাস, লুম্পেন্সি) করার জন্য। এখানে উল্লেখ্য জনরোষ ও মববাজী এক নয়। জনরোষ তৎক্ষণাৎ বিষয় আর মববাজী পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক বিষয়। ফ্যাসিষ্ট জার্মানির হিটলার ও ইতালির মুসোলিনি এই ধরনের গেষ্টাপো বাহিনী তৈরি করেছিল মববাজী (সন্ত্রাস) করার জন্য। বিরোধী মতালম্বীদের নিকেশ করার জন্য। হিটলারের শাসন ব্যবস্থা ছিল চরম একনায়কতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী। তার এই শাসনপদ্ধতিকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টোটালিটারিয়ান’ (Totalitarian) বা সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র বলা হয়, যেখানে মানুষের জীবনের প্রতিটি অংশ সরকার নিয়ন্ত্রণ করত। সহজ কথায়, হিটলারের শাসন ব্যবস্থা ছিল এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সাধারণ মানুষের কোনও অধিকার ছিল না, পুরো দেশ চলত কেবল একজনের ইচ্ছা ও সামরিক শক্তির জোরে।
আমাদের রাজ্যে জনরোষের নাম করে বিষয়টা সামনে আনা হচ্ছে যখন চারিদিকে হকার উচ্ছেদ চলছে, বৈধ নাগরিকদের সীমান্ত পার করার চেষ্টা চলছে, এসআইআরে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে, হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন শাসকদল করছে ঠিক এসময় ’মববাজী প্রকল্প’ নেওয়া হয়েছে। মববাজী করার জন্য পার্টি তহবিল থেকে বিশাল পরিমাণ টাকা আসছে আর এই টাকা জোগান দিচ্ছে কর্পোরেট। কর্পোরেট মিডিয়া জনসাধারণের সমস্যার চিত্র না তুলে ধরে শুধু জনরোষের চিত্র সামনে আনছে। ঠিক হিটলারের শাসন ব্যবস্থার মতো আমাদের রাজ্যে এক একনায়কতান্ত্রিক, স্বৈরাচারীরাজ কায়েম হচ্ছে।
আমাদের রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দলগুলি বিশেষকরে সিপিএম এই ঘটনাগুলির জোরদারভাবে বিরোধিতা করছে না। সিপিএম মনে করে তৃণমূল তাদের রাজ্যে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছে, শাসন ক্ষমতায় থাকাকালীন তৃণমূল তাদের পার্টি অফিস দখল ও কর্মীদের উপর অত্যাচার করেছে, অতএব এখন যা হচ্ছে বিজেপি-র মববাজীকে নীরবে সমর্থন করছে। উপরিউক্ত ঘটনাগুলো ঠিক। কিন্তু সিপিএম এটা বুঝতে পারছে না, বিজেপি-আরএসএস কত বড় প্রতিক্রিয়াশীল দল। এই ফ্যাসিবাদী দল একবার যেখানে ক্ষমতায় আসে সেখান থেকে তাদের হটানো কঠিন হয়। সিপিএম ‘আগে রাম পরে বাম’ ফর্মুলা আর কিছুদিন পর বুঝতে পারবে যখন তাদের উপর আক্রমণ নেমে আসবে।
বিজেপি আরএসএস-এর মববাজী আর কিছুদিন পর সংখ্যালঘুদের উপর নেমে আসবে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই দেশের মৌলবাদীর ঠিক একই কাজ করেছিল। জনরোষের নামে আওয়ামী লিগ নেতা ও কর্মীদের ওপর অত্যাচার ও হত্যা, পরে এই জনরোষ মৌলবাদীদের লুম্পেন বাহিনীর মববাজীতে পরিবর্তন হয়ে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার শুরু হয়। একইভাবে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদীদের দ্বারা এরাজ্যে বাংলাদেশের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
রাজ্যের শ্রমজীবী জনগণকে বিজেপি আরএসএস-এর লুম্পেন বাহিনীর মববাজীর বিরুদ্ধে শ্রমজীবীদের স্বার্থে রুখে দাঁড়াতে হবে।

ছবি : পার্থ মিত্র

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী

73 Views