অনিন্দ্য হাজরা

নিউজক্লিক-এর সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি এফআইআর এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর মামলা খারিজ করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। ১০ জুন দিল্লি হাইকোর্টের এই রায় প্রকাশের পর তা নিয়ে ‘অল্টনিউজ’-এর সঙ্গে কথা বলেন প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর পুরকায়স্থ। এই রায়, আইনি প্রক্রিয়ার ফলে হওয়া মানবিক ভোগান্তি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর ভূমিকা এবং ভারতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের ওপর এই রায়ের প্রভাব নিয়ে অল্টনিউজ-এর সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। প্রবীর পুরকায়স্থ এবং নিউজক্লিক-এর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলাটি ২০২০ সালে দায়ের করা হয়ে। অভিযোগ ছিল, ভারতের সংবাদমাধ্যমের পরিসরে চীন-পন্থী বিষয়বস্তু প্রচারের উদ্দেশ্যে চীন-ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংস্থাটি মোট ৩৮ কোটি টাকার বিদেশি অর্থ সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড মিডিয়া হোল্ডিংস এলএলসি’-র কাছ থেকে প্রাপ্ত ৯.৫৯ কোটি টাকা এবং ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাওয়া আরও ২৮ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৩ সালে দিল্লি পুলিশ ‘বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন’ বা ইউএপিএ-র ধারা প্রয়োগ করে। পুলিশের অভিযোগ ছিল, এই অর্থ লেনদেনের সূত্রটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী নেভিল রয় সিংহামের সঙ্গে যুক্ত, যার বিরুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘নিউজক্লিক’-এর সম্পাদক এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান অমিত চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই অর্থায়নের সূত্রের (ফান্ডিং ট্রেইল) অভিযোগে দিল্লি পুলিশ পুরকায়স্থকেও ইউএপিএ (UAPA) আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করে। ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে ছিলেন তিনি। এরপর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিনের আদেশ দেয়। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, তাঁকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল বেআইনি। সম্প্রতি এক কঠোর পর্যবেক্ষণে বিচারপতি নিনা বনসাল কৃষ্ণা মন্তব্য করেছেন যে, ইডি-র এই মামলা চালিয়ে যাওয়া ছিল ‘আইনি প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়…’। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই আইনি কার্যক্রম কেবল দুরভিসন্ধিমূলকই ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর এক স্বেচ্ছাচারী আক্রমণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। এখানে ‘

অল্টনিউজ’-এর সঙ্গে পুরকায়স্থের কথোপকথনের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো:
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায় সম্পর্কে আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী?
স্বস্তির একটা অনুভূতি কাজ করছে। তবে একই সঙ্গে, আমি এই অনুভূতিকে খুব বেশি বাড়িয়ে দেখতে চাই না, কারণ আরও কিছু মামলা এখনও বিচারাধীন এবং তারা দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়কে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা করছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। তবে তা সত্ত্বেও, ‘নিউজক্লিক’, আমার ব্যক্তিগত জীবন এবং বৃহত্তর সাংবাদিক সমাজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গত ছয় বছরে এইসব অভিযোগ ‘নিউজক্লিক’-এর ওপর কী প্রভাব ফেলেছে?
নিউজক্লিক-এর জন্য এ ছিল এক বিশাল আঘাত। আর সেই ধাক্কা সামলে ওঠা মোটেও সহজ ছিল না। তবে এর প্রভাব কেবল প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এর সাথে জড়িত মানবিক ক্ষতির দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সাংবাদিকরা হঠাৎ করেই তাঁদের চাকরি হারিয়েছিলেন।
এই পুরো ঘটনায় কতজন মানুষ চাকরি হারিয়েছিলেন?
আমাদের সাথে দুই ধরনের কর্মী কাজ করতেন—বেতনভুক্ত সাংবাদিক এবং স্বতন্ত্র অবদানকারী বা ইনডিপেন্ডেন্ট কনট্রিবিউটর্স। সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭৫-৮০ জনের মতো।
আপনার গ্রেপ্তারের পর নিউজরুমের কী অবস্থা হয়?
বিশেষ করে আমার গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতির ওপর যে প্রভাব পড়ে, তাকে কেবল ‘মারাত্মক’ বললে কম বলা হবে। কার্যত প্রতিষ্ঠানটি আর কাজ চালিয়ে যেতে পারছিল না। এটাই ছিল মূল সমস্যা। অধিকাংশ কর্মী বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজতে বাধ্য হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের পাওনা অর্থ আটকে রাখা হয়, যার মধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ডের জমানো টাকাও রয়েছে। ‘নিউজক্লিক’-এর সাথে যুক্ত সেই ৭৫-৮০ জন মানুষের ওপর দিয়ে বড় ধরনের ধকল যায়। এমনকি আজও প্রায় ২৫-৩০ জন মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং মূলত আংশিক সময়ের কাজের ওপর নির্ভর করে টিকে আছেন। এর পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, তাঁদের অনেকেরই পেশাগত বিশেষ দক্ষতা গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয়ত, অনেক সংবাদমাধ্যমের কাছেই ‘নিউজক্লিক’ থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়াটা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তদন্তাধীন কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে আসা কাউকে নিয়োগ দিলে নিজেরাও হয়তো বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাই কাজ করছিল। আমার দৃষ্টিতে, পুরো ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো এটাই—তীব্র ভয়ের পরিবেশ।

একজন সাংবাদিক হিসেবে, হাইকোর্টের আদেশটি পর্যালোচনা করলে এর গভীর তাৎপর্য কী বলে আপনার মনে হয়?
ইডি-র মামলাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী আইন এবং প্রতিরোধমূলক আটক-এর মতো আরও অনেক আইন রয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে এসবই বিভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এগুলোর যেকোনও আইনই ব্যবহার করা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়টি হলো, সংবাদমাধ্যম যখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে বা তার ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন কী ঘটে। দুর্ভাগ্যবশত, সংবাদমাধ্যমের ওপর এর প্রভাব এখন আর কেবল সাংবাদিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আজ যখন আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট করেন, তখন কি আপনিও সংবাদমাধ্যমের অংশ হয়ে ওঠেন না? এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মানুষ প্রায়শই এটা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে, জনপরিসরে তারা যা করেন, তা কোনও কোনও ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কাজের মতোই। যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসারের ফলে যেমন ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসর বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি এ ধরনের হস্তক্ষেপের পরিধিও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনকে প্রায়শই ‘নিউজক্লিক’-এর ওপর চলা কঠোর নজরদারির ক্ষেত্রে একটি সন্ধিক্ষণ বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, চীনের সরকারি বয়ান বা আখ্যান প্রচারের বিনিময়ে আপনারা অর্থ নিয়েছিলেন। এখন পেছন ফিরে তাকালে, সেই প্রতিবেদন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তার ভূমিকা সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?

ভারতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে এবং অনেকেই তাদের প্রতিবেদনকে বিনা প্রশ্নে সত্য বলে মেনে নেন। আমাদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। আমার মতে, নিউ ইয়র্ক টাইমস এক্ষেত্রে একটি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা পালন করেছিল। চীনের সাথে কোনও যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার সময় তারা বারবার নিউজক্লিকের মাত্র একটি প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেছিল। আমার জানা মতে, ওই অভিযোগগুলোর সমর্থনে নিউজক্লিকের অন্য কোনও প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়নি। তারা যে প্রতিবেদনটির কথা বলেছিল, সেটি ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এবং ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে মুক্তি আন্দোলন হয়েছিল, তাতে চীনা বিপ্লব ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—যার প্রশংসা স্বাধীন ভারতও করেছিল। সেই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করাকে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রচারের (প্রোপাগান্ডা) সমতুল্য বলে গণ্য করাটা একেবারেই অযৌক্তিক। নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে ঔপনিবেশিকতা হয়তো কোনও বড় বিষয় নয়, কিন্তু আমাদের চেতনার গভীরে এটি গভীরভাবে প্রোথিত। মানচিত্র সংক্রান্ত অভিযোগগুলোও ছিল একইভাবে ভিত্তিহীন। সম্ভবত আমরাই ছিলাম হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের মধ্যে একটি, যারা সবসময় ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মানচিত্র ব্যবহার করত। নিউজক্লিক কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিটি মানচিত্রই ‘সার্ভেয়ার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া’-র প্রকাশিত মানচিত্রের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা হতো। আমরা ‘চীনা মানচিত্র’ ব্যবহার করছিলাম—এই দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বিদ্রূপের বিষয় হলো, আমার গ্রেপ্তারের পর যখন সাংবাদিকরা ‘নিউজক্লিক’-এর সমর্থনে বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন, তখন দিল্লিতে কর্মরত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিনিধিরাও তাতে অংশ নিয়েছিলেন। আমার বিশ্বাস, এমন এক পরিবেশ তৈরিতে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল যা এই দমন-পীড়নের পথ প্রশস্ত করেছে। বৃহত্তর পরিসরে বলতে গেলে, আমার মনে হয় বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রায়শই এক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। অন্যান্য অনেক প্রকাশনার তুলনায় তাদের সম্পাদকীয় অবস্থান হয়তো কিছুটা প্রচ্ছন্ন বা সূক্ষ্ম হতে পারে, কিন্তু ফিলিস্তিনের মতো বড় ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের সময় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমার দৃষ্টিতে, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সংবাদ পরিবেশনা ‘নিউজক্লিক’-এর বিরুদ্ধে চালানো প্রচারকে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা করেছিল যার ফলে আমাদের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব হয়। বিচারকও পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি নিয়ে সমালোচনা করেন।

প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর পুরকায়স্থ বা পদ্ধতিগত বিষয়—যদিও আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে যে এক্ষেত্রে কোনো মামলা দাঁড়ায় না। আমার কাছে বিষয়টি অনেক বড় একটি প্রশ্নের সাথে জড়িত। জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিত?
রাষ্ট্রের হাতে থাকা বিভিন্ন হাতিয়ারের ব্যবহার এবং তা ব্যবহারের রাজনৈতিক পরিণতির প্রতি জনগণ কীভাবে সাড়া দেয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আমার ধারণা, এই রায়ের পর দুটি বিষয় ঘটতে পারে। প্রথমত, সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য মানুষ হয়তো আরও বেশি সাহস পাবে। দ্বিতীয়ত, সরকার যেভাবে অত্যন্ত নগ্নভাবে সমালোচনা দমনের চেষ্টা করেছে—যার উল্লেখ খোদ রায়েও রয়েছে—তা হয়তো কিছুটা সংযত হবে। সরকারি কর্মকর্তারাও হয়তো এখন অনুভব করতে শুরু করবেন যে, আইনের সীমা লঙ্ঘন করলে কোনও একদিন তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার ভারসাম্য রাষ্ট্রের অনুকূলে অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকে ছিল। আমার মনে হয়, এই রায় সেই ভারসাম্যকে—অন্তত কিছুটা হলেও—আবার জনগণের দিকে ফিরিয়ে এনেছে। আমার কাছে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

সৌজন্যে : দ্য ওয়ার ডট ইন (thewire.in)
অনুবাদ আমাদের।

62 Views